ব্রেকিং নিউজ :
August 27, 2017

ধর্মগুরু রাম রহিম সিংয়ের যতো অপকর্ম

ভারতের ধর্মগুরু গুরমিত রাম রহিম সিং দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয়। জনপ্রিয় হলেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অপকর্মের অভিযোগ। সম্প্রতি গুরু রাম রহিম সিংকে ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। ২০০২ সালে দুই নারী অনুসারীকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় শুক্রবার এ রায় দেয় হরিয়ানার এক আদালত৷ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাত থেকে দশ বছর কারাদণ্ড হতে পারে রাম রহিমের৷ তবে দণ্ড ঘোষণা করা হবে আগামীকাল সোমবার৷

তুমুল জনপ্রিয় হলেও গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অপকর্মের অভিযোগ। আসুন এক নজরে জেনে নিই সে সম্পর্কে-

বিলাসবহুল প্রাসাদে সেরা সুন্দরী

বিতর্কিত গুরু রাম রহিম প্রায় হাজার একর জমির মাঝখানে আয়নায় মোড়া এক প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন। তার নাম ‘বাবা কি গুফা’। দামি আসবাব, সোফা, পর্দায় সাজানো বিলাসবহুল সেই প্রাসাদেই বাস গুরমিত রাম রহিম সিংহের। গুফায় তাকে ঘিরে থাকেন ২০০ জনেরও বেশি বাছাই করা শিষ্যা। তাদের চুল খোলা। পরনে সাধ্বীদের মতো দুধসাদা রঙের পোশাক। এরাই রাম রহিমের যত্নআত্তি, দেখভাল করেন। সেই গুফায় প্রবেশাধিকার আছে মাত্র কয়েক জনের। তাও আঙুলের ছাপ, চোখের মণি-র মতো বায়োমেট্রিক তথ্য মিললে তবেই ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মেলে।

বিলাসবহুল ১০০টি গাড়ি  

ধর্মগুরু হলেও রাম রহিমের পছন্দ শিফনের রঙবেরঙের জামা, বাহারি জুতো। তার জামাকাপড় তৈরির জন্য নিজস্ব ফ্যাশন ডিজাইনার রয়েছেন। রয়েছেন নিজস্ব ‘হেয়ার ড্রেসার’-ও। রাম রহিমের কনভয়ে বিলাসবহুল ১০০টি গাড়ি। তার মধ্যে ১৬টি কালো রঙের ফোর্ড এনডেভার। বাবা প্রাসাদ থেকে বের হলে সব গাড়ি তাবু দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। বাবা নিজেই ঠিক করেন, তিনি কোন গাড়িতে উঠবেন। বাবাজি ১৫ আগস্টেই ৫০ বছরে পা দিলেন। সেদিন ৩ ইঞ্চি মোটা, ৪২৭.২৫ বর্গফুটের কেক তৈরি হয়েছিল।

শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অশান্তি

১৯৯৮ সালে বেগু গ্রামের একটি শিশু ডেরার জিপে চাপা পড়ে মারা যায়। গ্রামবাসীদের সঙ্গে ডেরার বিরোধ শুরু হয়। আর সেই খবর প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের ধমক দেওয়া হয়, হুমকি দেওয়া হয়। পরে ডেরা সাচ্চা সৌদা আর সাংবাদিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির মিটমাট হয়।

আস্তানায় ধর্ষণ চেম্বার

গুরু রাম রহিম নিজেকে দেবতা দাবি করে তার সেবায় নিয়োজিত নারীদের ধর্ষণ করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যে দুই নারী রাম রহিমের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন, তাদের লিখিত জবানবন্দিতে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ধর্ষণের প্রায় ১০ বছর পর রাম রহিমের দুই সেবিকার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয় ২০০৯ ও ২০১০ সালে। ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) বিচারকদের সামনে দুই নারীর জবানবন্দির যে নথি হাজির করা হয়েছে, এতে  অভিযোগের ধারাবাহিক বর্ণনা রয়েছে। গোপন আস্তানায় ধর্মগুরু রাম রহিম কীভাবে তার সেবিকাদের ধর্ষণ করেন, তার রোমহর্ষক বর্ণনা ওঠে এসেছে এতে। জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে রাম রহিমের ধর্ষণ চেম্বার। এর নাম ‘গুফা’। সাধ্বী লাভের আশায় যেসব নারী আসতেন, তাদের এখানে নিয়ে যাওয়া হতো। শুধু নারী ভক্তদের রাম রহিমের সেবায় নিয়োজিত করা হতো এবং গুফার পাহারায়ও থাকত নারীরা।

দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে ধর্ষণ

২০০২ সালের মে মাসে ডেরা সাচ্চা সৌদার নারী ভক্ত গুরমিত রাম রহিমের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেনামী চিঠি পাঠান। ধর্ষণের শিকার দুই নারী অভিযোগ করেন, রাম রহিম যখন ধর্ষণ করতেন, তখন তিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করতেন এবং দেবতার মর্যাদায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতেন। এছাড়া রাম রহিমের ধর্ষণকাণ্ডকে তার ভক্তরা ‘মাফি’ (ক্ষমা) বলে অভিহিত করতেন। নিজের গোপন ডেরায় আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে নারীদের সম্মোহিত করার চেষ্টা করতেন রাম রহিম।

এক অভিযোগকারী জানান, এক রাতে বাবা রাম রহিম তাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি রাম রহিমের ঘরে ঢুকতেই ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। রাম রহিম সেই সময় পর্নোগ্রাফি দেখছিলেন এবং তার হাতে রিভলভার ছিল বলে অভিযোগকারীর দাবি। সে রাতে রাম রহিম তাকে ধর্ষণ করেন এবং তারপর থেকে টানা তিন বছর তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়। ডেরা সচ্চা সওদার অন্য সন্ন্যাসিনীদেরও রাম রহিম ধর্ষণ করেন বলে জানান তিনি।

হরিয়ানা রাজ্যের যমুনানগরের যে নারী রাম রহিমের ধর্ষণের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের বিচারক একে ভার্মার সামনে তার জবানবন্দি দেন, তিনি জানান, ভাইয়ের কারণে ১৯৯৯ সালে রাম রহিমের সেবায় নিয়োজিত হন তিনি। তার ভাই গুরুর অন্ধভক্ত ছিলেন। কিন্তু ধর্ষণের পর বোনের পক্ষে বিচার চাওয়ায় তাকে খুন করা হয় বলে দাবি করেন ওই নারী।

সাংবাদিক হত্যা

২০০২ সালে সিরসা থেকে প্রকাশিত সান্ধ্য দৈনিক ‘পুরা সচ’ (সম্পূর্ণ সত্য) এর সম্পাদক রামচন্দ্র ছত্রপতিকে তার বাড়ির সামনেই গুলি করা হয়। অভিযোগের আঙুল সেই ডেরার দিকেই ওঠে।

শিখ সম্প্রদায়ের সঙ্গে তুমুল বিরোধ

২০০৭ সালে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় যে রাম রহিম এমন পোশাক পড়ছেন, যেগুলো দশম শিখ ধর্মগুরু গোবিন্দ সিংয়ের পোশাকের মতো। শিখ সম্প্রদায়ের মানুষরা বিক্ষোভ শুরু করেন, রাম রহিমের কুশপুতুল জ্বালিয়ে দেন। এরপর সেখানেই ডেরা সমর্থকরা ওই শিখ প্রদর্শনকারীদের ওপরে হামলা চালায়। তারপর থেকে গোটা উত্তর ভারত জুড়েই ডেরা সমর্থক আর শিখদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।

শিখ সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে গুলি

শিখ সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ এক কর্মসূচিতে গুলি চালানো হয়। তখন ডেরা সমর্থকদের দিকে আবারও অভিযোগ ওঠে। ওই গুলি চালনায় এক শিখ যুবক মারা গিয়েছিলেন। শিখ সম্প্রদায় গুরমিত রাম রহিমের গ্রেফতারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তখন থেকেই ডেরা প্রধান রাম রহিমের ওপরে পাঞ্জাবে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

বিচারককে হুমকি

দুটো হত্যা আর ধর্ষণের মামলার তদন্ত করে সিবিআই যখন গুরু রাম রহিমকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে, বিচারক তাকে আদালতে হাজিরার নির্দেশ দেন ২০০৭ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে। ওই বিশেষ আদালতের বিচারককে হুমকি চিঠি দেওয়া হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

প্রাক্তন ম্যানেজারের গুম-হত্যা

২০১০ সালে ডেরার প্রাক্তন সন্ন্যাসী রামকুমার বিষ্ণোই হাইকোর্টের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলেন যে, আশ্রমের প্রাক্তন ম্যানেজার ফকির চাঁদকে গুমখুন করা হয়েছে। তিনি ওই ঘটনায় সিবিআই তদন্ত দাবি করেন। ডেরা প্রধান রাম রহিমই ওই গুমখুনের আদেশ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়।

ডেরার সাধুদের নপুংসক করে দেওয়ার অভিযোগ

হংসরাজ চৌহান নামের এক ব্যক্তি ২০১২ সালে ভারতের হাইকোর্টে মামলা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ডেরা প্রধান রাম রহিমের নির্দেশে আশ্রমের ৪০০ সাধুকে নপুংসক করে দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক ছত্রপতি হত্যায় অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিও ডেরার নপুংসক সাধু ছিলেন বলেও সেই মামলায় জানানো হয়। তারা তখন জেলে বন্দী ছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সত্যিই ওই দুই সাধুকে নপুংসক করে দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা এটাও বলে যে তারা স্বেচ্ছায় নপুংসক হয়েছে। সেই মামলা এখনও বিচারাধীন। তবে রাম রহিম এই অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

সূত্র বিবিসি বাংলা

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ bangladesh24online.news@gmail.com

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।