ব্রেকিং নিউজ :
September 9, 2017

সাইকেলেই হিমালয় জয় চন্দনের!

১৫৩ দিনে ৪টি দেশের ৬২৪৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সদ্য ঘরে ফিরেছেন হৃদয়পুরের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী চন্দন বিশ্বাস। হিমালয়ের বুক চিরে সাইকেল চালানোর সেই অভিজ্ঞতার কথা,  রোমহর্ষক অভিযানের গল্প সত্যিই অন্যরকম।

চন্দন বিশ্বাস বলেন, গত ২২ জুলাই দিল্লি থেকে দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরেই পড়েছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস। কারণ, পাঁচ মাস পাহাড় আর প্রকৃতির বুকে একা ঘোরার পরে এবার দম ফেলার পালা। সাইকেলে ‘ট্রান্স হিমালয়ান ট্রেল’ সম্পূর্ণ করার যে স্বপ্নটা গত বছর দেখেছিলাম, সেটা পূরণ করতে পেরে সেদিন এক অদ্ভুত আনন্দ এবং ভাললাগা ঘিরে রেখেছিল আমাকে। আগামী কয়েকমাস আর নেই কোনও নতুন অ্যাডভেঞ্চার। শু‌ধু বিশ্রাম নেওয়া আর পুরনো অ্যাডভেঞ্চারের স্মৃতি।

রাস্তাটা ছিল কলকাতা-বাংলাদেশ-ত্রিপুরা-নাগাল্যান্ড-অরুণাচলপ্রদেশ-মেঘালয়-অসম-উত্তরবঙ্গ-ভুটান-সিকিম-নেপাল-উত্তরাখণ্ড-হিমাচলপ্রদেশ-লাদাখ (জম্মু এবং কাশ্মীর)। টেকনিক্যালি এটাকে ট্রান্স-হিমালয়ান ট্রেল বলে। সোজা বাংলায় বললে, হিমালয়কে আড়াআড়ি পেরোনো।  ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সাইকেলে মালপত্র (সাইকেল-সহ প্রায় ৫০ কিলোগ্রাম) চাপিয়ে দুগ্গা-দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম ঘর থেকে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমদিনই ঢুকে পড়লাম বাংলাদেশ, যশোর। সোজা রাস্তায় ঢাকা পৌঁছনোর ইচ্ছে ছিল না। চলে গেলাম বরিশাল। সেখান থেকে সারারাত লঞ্চে করে ঢাকা। ওই লঞ্চযাত্রার কথা ছোটবেলা থেকে বহু বইয়ে পড়েছি। নিজের একবার অভিজ্ঞতা হওয়ার দরকার ছিল। তাই এবার সুযোগটা হাতছাড়া করিনি। গত ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ঢাকা পৌঁছে শহিদবেদিতে মাল্যদান করলাম। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ এবং খাদ্যবিলাসী। শুধুমাত্র খাদ্য অভিযানেই আরও একবার বাংলাদেশে যাওয়া যেতেই পারে। দিনদশেক বাংলাদেশে কাটিয়ে আখাউড়া বর্ডার দিয়ে ত্রিপুরা পৌঁছেছিলাম। একে একে ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, অসম পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের উত্স সন্ধানে পৌঁছলাম অরুণাচলের পসিঘাটে। ভারতের পূর্বপ্রান্তের শেষতম জেলাশহর। হিমালয় শুরু।

যাত্রার সময় আমি সাধারণত সকাল থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত সাইকেল চালাতাম। তারপর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে সেখানকার প্রশাসনিক দফতর বা থানায় গিয়ে যোগাযোগ করতাম। কাগজপত্র দেখানোর পরে আধিকারিকরাই রাতে থাকার ব্যবস্থা করতে সাহায্য করতেন। আমিও সেই সব পরিস্থিতিতে দিব্যি মানিয়ে নিতাম। তবে পসিঘাট থেকে সেশনে পৌঁছে পরিস্থিতি একটু পাল্টাল। থাকার তেমন বন্দোবস্ত না হওয়ায় সেদিন আমাকে অভিযানে প্রথমবারের মতো জঙ্গলে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে হয়। উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি আচার, ব্যবহার, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক দিক থেকে বাকি ভারতের চেয়ে অনেকটাই স্বতন্ত্র। পর্যটকরা সব জায়গায় গিয়ে উঠতেও পারেননি। কিন্তু সবুজের যদি নেশা থাকে তাহলে উত্তর-পূর্ব ভারতে আপনাকে যেতেই হবে।

আমার পরিকল্পনা ছিল, মণিপুর দিয়ে মায়ানমারও যাব। কিন্তু অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেই আশা অপূর্ণ থেকে গেল। যাই হোক, ধীরে ধীরে পৌঁছলাম অরুণাচলের আলং। রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজের সঙ্গে দু’দিন আলাপ-আলোচনা হল। ইতিমধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। থেমে থেমে এগোচ্ছি। এর মধ্যে গহপুরে এক তথাকথিত ভূত বাংলোয় থাকতে হল! যদিও তেমন কিছু হল না। অবশেষে তেজপুর গুয়াহাটি হয়ে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পৌঁছলাম উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার। কিছুদিনের বিশ্রাম নিয়ে জয়গাঁও হয়ে ভুটান ঢুকতে গিয়েই বিপত্তি। চলতি বছর থেকে ভুটানে সাইকেল নিয়ে ঢোকার কোনও অনুমতি নেই। অগত্যা ফুন্টসলিংয়ে একটা রাত কাটিয়ে ভুটানের বদলে সিকিম ঘুরে চলে এলাম শিলিগুড়ি। সেখানে আবার নতুন বিপদ— ‘ফুড পয়জনিং’। বসে থাকতে হল ১৫ দিন।

সুস্থ হয়ে পুনরুদ্যমে লেগে পড়লাম। পানিট্যাংকি কাকরভিটা বর্ডার দিয়ে সোজা নেপাল। ইস্ট-ওয়েস্ট হাইওয়ে। প্রায় ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি গরম। হিমালয়ের পাদদেশে এরকম চাঁদি ফাটানো গরম হবে, তা কে জানত। ওই সময় গরম থেকে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি পাহাড়ে ওঠার জন্য দিনে ১০০ কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালিয়েছি। প্রতিদিন ওআরএস, লেবু আর ১০-১২ লিটার জল নিয়ে সংসার পেতেছি।   নেপালে গিয়ে জীবনে প্রথম শ্মশানে থাকার অভিজ্ঞতা হল। শ্মশানের মন্দির। বিষণ্ণ বৃদ্ধ পুরোহিত গল্প করতে করতে রান্না করে খাওয়ালেন। বেলবাড়ি, কল্যাণপুর, বর্দিবাস— এইসব তরাই অঞ্চল পেরিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ের দিকে উঠলাম। সিন্ধুলী, মঙ্গলতার, ধূলিখেল হয়ে পৌঁছলাম কাঠমাণ্ডু। আর্থসামাজিক দিক থেকে নেপাল খুব ভাল জায়গায় নেই। প্রায় ১০০ শতাংশ জিনিসপত্র ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। পর্যটন ছাড়া অন্য কোনও শিল্পও বিশেষ নেই। ফলে জিনিসপত্রের দাম খুব চড়া। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সেরা। কাঠমাণ্ডু থেকে পরবর্তী গন্তব্য ছিল পোখরা। অনেকখানি নীচে নেমে আবার অনেকখানি উপরে উঠতে হবে। সেই চড়াই-উতরাইয়ে নির্দিষ্ট সময়ের আরও দু-তিনদিন বেশি সময় লেগে গেল পোখরা পৌঁছতে। বিশাল অন্নপূর্ণার পাদদেশ। অন্নপূর্ণার দিকে তাকিয়ে বসে থাকলেই সারাদিন কেটে যাবে।

পোখরা থেকে পরে নেমে চলে এসেছি বুটওয়াল লুম্বিনি, বুদ্ধদেবের জন্মস্থান। মাঝে একটা জায়গা পড়েছিল, নামটা খুব সুন্দর, ‘তানসেন’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনও বর্ণনা হয় না। তবে ওই সৌন্দর্যের মধ্যেও সমস্যাটা হল গরম। এবার সেটা ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। সেই গরমের মধ্যেই এগিয়েছি উত্তরাখণ্ডের দিকে। মহেন্দ্রনগর চেকপোস্ট পেরিয়ে ভারতে ঢুকলাম। হরিদ্বারের দিকে এগোচ্ছি। হরিদ্বার খুব ভাল জায়গা, কিন্তু আমার জন্য নয়। এতদিনের মধ্যে এই প্রথম থাকার সমস্যায় পড়েছিলাম। কোনও ধর্মশালা বা হোটেল একা কাউকে থাকতে দিতে রাজি নয়। একা ব্যক্তি নাকি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়। আমি অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। বললাম, ‘‘কলকাতা থেকে বেরিয়ে চারমাস ধরে চারটে দেশ ঘুরে আত্মহত্যা করতে হরিদ্বার আসিনি!’

কিন্তু কে শোনে কার কথা, ধর্মশালা কর্তৃপক্ষ তাঁদের সিদ্ধান্তে অবিচল। অবশেষে পুলিশের হস্তক্ষেপে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ প্রথমে নিমরাজি হয়েও পরে থাকতে দিয়েছে। এরপর দেহরাদূন। দেহরাদূনে দূন ইউনিভার্সিটি। সুচন্দনের সৌজন্যে ফ্যাকাল্টি গেস্ট হাউসে ছিলাম। দারুণ সবুজ ক্যাম্পাস। একদিকে দেহরাদূন শহর, অন্যদিকে জঙ্গল। ফ্যাকাল্টি এবং স্টুডেন্টদের সঙ্গে দারুণ সময় কেটেছে।  সেখান থেকে শিমলা পৌঁছে একদিন সকালবেলা ডর্মিটরির ছাদে বসে মায়ের সঙ্গে ফোনে বকবক করছি, সাইকেল রাস্তায় রাখা। হঠাৎ দেখি, এক ভদ্রলোক আমার সাইকেল ধরে টানাটানি করছেন। আশেপাশের লোকজনের কাছ থেকে শুনেছেন, সাইকেল নিয়ে কেউ একজন কলকাতা থেকে শিমলা এসেছেন, ব্যস উনি আলাপ করতে এলেন।
খুব চেনা লাগছিল ভদ্রলোককে। যাই হোক কথাবার্তা শুরু হল,
-নাম কেয়া হ্যায় আপকা?
-চন্দন, চন্দন বিশ্বাস। আপকা?
-লাকিজি গুপ্ত।
-ওয় তেরি! আপ ‘মা মুঝে টেগোর বনা দে’ওয়ালা লাকিজি গুপ্ত হো!

থিয়েটারের সঙ্গে সামান্য কাজ করেছি একসময়। এখন আর সেভাবে জড়িত না থাকলেও একনিষ্ঠ দর্শক তো বটেই। ‘মা মুঝে টেগোর বনা দে’ নাটকটি আমি নিজে তিনবার দেখেছি। একবার ছোট্ট ভূমিকাও ছিল আমার। সেই লাকিজি গুপ্ত যখন হিমাচলের রাস্তায় পরিচয় করতে আসেন, তখন অবাক তো হবই। কে ভেবেছিল হিমাচল প্রদেশে আমার জন্য এই সারপ্রাইজ লুকিয়ে আছে। ওঁর সঙ্গেই থেকেছি, ঘুরেছি। অভিযানের মধ্যেই ওই কয়েকদিন পারফরম্যান্স এবং থিয়েটার নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয়েছে।

শিমলার পর কোর হিমালয়ান রিজিয়ন শুরু। শুরু হল আমার ট্রান্স-হিমালয়ান সাইকেল অভিযানের শেষ এবং সবচেয়ে বিপদসংকুল অংশ— স্পিতি ভ্যালি এবং লাদাখ ভ্যালি। কাজা পর্যন্ত রাস্তা ছিল পুরোটাই স্ক্রি জোন, রক ফল জোন। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে হাওয়া দিচ্ছে, ফলে রক ফলের (পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হঠাৎ পাথর গড়িয়ে পড়া) সম্ভাবনা থাকে বেশি। এক এক সময় তো ফুটবলারের মতো ডজ করে এগোতে হয়েছে। ভারতীয় সেনা কেন ওদের ম্যান্ডেটে ওই রাস্তাকে ভারতের সবচেয়ে বিপজ্জনক রাস্তা বলে, সেটা হাড়েহাড়ে  বুঝেছিলাম। কাজা থেকে বাতাল হয়ে কোকসার পর্যন্ত ১৫টির বেশি ঝোরা বা নালা পেরিয়েছি। রাস্তা বলে কিছুই নেই। ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি একসময় রাস্তা দিয়েও সাইকেল চালাতাম। রাস্তা দিয়েই নদী বইছে। শেষ মুহূর্তে একবার ধসের মুখেও পড়েছিলাম।

গত ১৮ জুলাই লাদাখের নুব্রা ভ্যালির হুন্ডার পৌঁছই। শেষের যাত্রাটা সহজ ছিল না। গত কয়েকমাসে এক নাগাড়ে ১০ হাজার ফুটের উপরে থেকেছি। পেরোতে হয়েছে কুনজুম, বাড়ালাচা, ট্যাংলাং, খারদুঙের মতো একাধিক হাই অল্টিচিউড বিপজ্জনক পাস। প্রায় শূন্য ডিগ্রির কাছে তাপমাত্রা ছিল কোনও কোনও জায়গায়।
গোটা অভিযানে মাত্ৰ দু’বার গাড়ির মাথায় সাইকেল চাপাতে হয়েছে। কখনও খারাপ রাস্তায় আটকে পড়া অন্যের গাড়ি নিজে পাস করিয়েছি। দু’বার দুর্ঘটনা আর কোকসারের কাছে একবার ধসের মুখেও পড়েছি। পেরিয়েছি গঙ্গা, যমুনা এবং ব্রহ্মপুত্র– সহ ছোটবড় ১০০টারও বেশি নদী। আর এই সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ১৫৩ দিনে সাইকেলে অতিক্রম করে ফেলেছি ৬২৪৯ কিলোমিটার রাস্তা।

পূর্বনির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শেষ হয়েছে আমার অভিযান। সেই অভিযানের কাগজপত্রে লেখা ছিল ‘সোলো রাইড’। কিন্তু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অন্তত হাজারখানেক মানুষের সাহায্য ও সমর্থন ছিল। আমার সংগঠন ‘সোনারপুর আরোহী’ এবং ‘ডিসকভার অন হুইলস’ ছাড়া এই অভিযান সম্ভব ছিল না। রাস্তায় অচেনা মানুষও আমাকে দেখে চিনতে পেরে যেভাবে আপন করে নিয়েছেন, তা-ও কখনও ভুলে যাওয়া যায় না। বাড়ি ফিরে যখন এই লেখা লিখছি, তখনও আমার সাইকেল ‘আনপ্যাক’ করা হয়নি। আপাতত ওটা থাক ওভাবেই। পরের অভিযানে বেরিয়ে পড়ার আগে ওটাও কিছুদিন বিশ্রাম নিক— আমারই মতো।

সূত্রঃ এবেলা

 

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ bangladesh24online.news@gmail.com

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।