ব্রেকিং নিউজ :
September 12, 2017

বৈষম্য চর্চা করেন সুবিধাভোগীরা, নিরানন্দ জীবন হয় অনেকের

আনিসুর রহমান এরশাদ

সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে বলেই দেখা যাচ্ছে, কেউ বিলাস বহুল গাড়ি-বাড়ি-শতকোটি টাকার  মালিক;  কেউ রাস্তার দু’ধারে বস্তিতে খোলা আকাশের নিচে বাস করে । দিনভর পরিশ্রমকারী রিক্সাওয়ালা, ঠেলাগাড়ি চালক, দিনমজুর, গৃহকর্মী, শ্রমিক যাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। একদিকে বাড়ছে উদ্বাস্তু;   আরেকদিকে বাড়ছে হোটেল –অবকাশযাপন কেন্দ্র-বিনোদন কেন্দ্র- নাইট ক্লাব ইত্যাদি।

একদিকে খাবারের জন্য হাহাকার,  আরেকদিকে বিলাসীতা ও অপচয়।  সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে কর্পোরেট খাতে বেতন বৈষম্য আছে, জেন্ডার বৈষম্য আছে, শ্রেণীগত বৈষম্য আছে, পেশাভিত্তিক বৈষম্য  আছে, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য আছে,  এলাকা-আঞ্চলিকতা-দল ভিত্তিক বৈষম্য আছে, উন্নয়ন  বৈষম্য আছে, সাম্প্রদায়িক বৈষম্য আছে, বয়স বৈষম্য আছে, জাতিগোষ্ঠী ভিত্তিক বৈষম্য আছে। কিছু সুবিধাভোগী লোক বৈষম্য লালন ও চর্চা করে চলে প্রতিনিয়ত!

যদি কোনো সমাজ-রাষ্ট্র-সংগঠন-সংস্কৃতি মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তাহলে তা’ হয় বর্বর সমাজ-ভঙ্গুর রাষ্ট্র-সন্ত্রাসী সংগঠন-অপসংস্কৃতি। কেউ মুসলমান নাকি হিন্দু, বাংলাদেশি নাকি পাকিস্তানি, ধনী নাকি গরিব, শিক্ষিত নাকি অশিক্ষিত, পুরুষ নাকি নারী, শিশু নাকি বৃদ্ধ, কালো নাকি ফর্সা, খাটো নাকি লম্বা, উঁচু জাত নাকি নিচু জাত- এসব কিছুর আগের পরিচয় তিনি মানুষ। সব মানুষের রক্তের রং এক, অশ্রু একই রকমের। ফলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ-বৈষম্য-হিংসা-বিদ্বেষ চাই না।

পৃথিবীটা সবার, সবারই বেঁচে থাকার সমান অধিকার আছে। সে পাহাড়ি হোক কিংবা রোহিঙ্গা হোক, ফিলিস্তিনি হোক কিংবা ইহুদি হোক। মানুষ তার মানবিকতার জন্য শ্রেষ্ঠ, মনুষ্যত্বের জন্য শ্রেষ্ঠ; পাশবিকতা-হিংস্রতার জন্য নয়। নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা, জোর করে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি নেয়ার চেষ্টা করা বড্ড বাড়াবাড়ি। আমিত্ব-আত্মপূজা-আত্মপ্রীতি-স্বার্থপরতা নিজের চেয়ে অন্যকে, নিজের দলের চেয়ে অন্য দলকে তুচ্ছ মনে করে। আমিই সেরা, আমার দলই শ্রেষ্ঠ, আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, আমিই বেশি জানি-বুঝি এমন ভাবনা জঘন্য। শ্রেষ্ঠত্বের মাপ কাঠি নিজের হাতে নিয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করা যৌক্তিক নয়। নিজে নিজে নেয়া সিদ্ধান্ত নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ে সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু মানুষের মাঝে ভেদাভেদ সৃষ্টিকারী মানুষগুলো কিন্তু নিজেরাই নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ বলে রায় দেয়।

সাদা মানুষ কালো মানুষদের থেকে, পুরুষরা নারীদের থেকে, এক ধর্মের অনুসারীরা আরেক ধর্মের অনুসারীদের থেকে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। অথচ অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ সর্বদাই কাম্য, সম্প্রীতি ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেশ ও দশের কল্যাণ-মঙ্গল করে। সম্প্রীতিপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষকে সমান চোখে দেখতে হবে, একই দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করতে হবে। যে মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদে সক্রিয়ভাবে অংশ্রগহণ করতে পারেন না, সম্পূর্ণভাবে অনুগত থাকতে হয় এবং আদেশ মানতে বাধ্য থাকেন- তিনি কখনো স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পান না। কেউ যদি সবল বলে দুর্বলের সাথে অমানবিক ব্যবহার এবং চরম জুলুম ও অত্যাচার করেন তা অসভ্যতা।

আপনি মালিক বলে যদি শ্রমিককে দাস মনে করেন, জমিদার বলে আশ্রয়হীনকে নিচু জ্ঞান করেন, সম্পদশালী বলে দরিদ্রকে মানুষই মনে না করেন, মন্ত্রী বলে মেথরকে মর্যাদা দিতে লজ্জা পান, কালো বলে সাদা রংয়ের মানুষকে সহ্য করতে না পারেন তাহলে আপনার পক্ষে মানবতার জয়গান গাওয়া সম্ভব হবে না। আপনি শিল্পপতি হলেও কৃষককে সম্মান করতে হবে, প্রধান নির্বাহী হলেও পিয়নকে মর্যাদা দিতে পারতে হবে। আপনি প্রতিষ্ঠানের মালিক কিন্তু মানুষের প্রভু নন, অন্যের অধিকারকে আপনি ক্ষুণ্ন করতে পারেন না। অসম সামাজিক সম্পর্ক কিংবা আধিপত্য ও বশ্যতার পরিণতি কখনো ভালো হয় না।

মানুষ মানুষের সম্পত্তি হতে পারে না। কেউ কারো মান-সম্মান-ইজ্জত-অধিকার ক্ষুণ্ন করার অবাধ স্বাধীনতা সভ্য-আধুনিক সমাজে পেতে পারে না। অথচ উচ্চ শিক্ষিত চাকরিজীবীরাও ব্যক্তিগত নীতি বা পারিবারিক শিক্ষার বাইরে গিয়েও উর্ধ্বতন বসের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য কাজ করেন। তারা ভুলেই যান সামাজিক স্তরবিন্যাসের কারণে ন্যায় কে অন্যায় আর অন্যায় কে ন্যায় বলার যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। দাস প্রথায় একজন মানুষকে অন্য মানুষের উপর মালিকানা আরোপের অধিকার দেয়, কিন্তু আধুনিক কর্পোরেটরাও যখন উৎপাদনের অন্যান্য উপাদানের মত শ্রমিককে একটি বস্তু মনে করেন- তখন তাকে আধুনিক দাসত্ব বলা যেতেই পারে।

মানুষে মানুষে সম্পর্ক যদি হয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ভর তবে সেই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় গরিবের কোনো সম্মান থাকতে নেই। তাকে আপনি কম পারিশ্রমিক দিয়েও কাজ করাতে পারবেন, নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অতিরিক্ত শ্রম শোষণ করতে পারবেন, প্রতিবাদী হলে দমিয়ে দিতে কঠোর নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নিতে পারবেন, যখন তখন চাকরিচ্যুত বা ছাটাই করতে পারবেন। সমাজ যদি শোষণমূলক হয় তবে সম্পদ অপদখল, জীবনের বিনাশ, জগতে অশান্তি অবধারিত হয়ে যায়। শুধু বেঁচে থাকায় জীবনের সার্থকতা নেই, সামাজিক মর্যাদা ও সম্মানজনক অবস্থানও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাপক অসমতা, শ্রেণি বৈষম্য ও শোষণে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকে না। দুর্বলের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো মূল্য থাকে না। সবল শ্রেণি যা বলেন এবং যে কাজ করান তা-ই তার জন্য চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতে থাকে। নিম্ন অবস্থায় যারা থাকে তাদের আবেগ-অনুভূতির কোনো মূল্য থাকে না, অনেক কাজই করতে হয় বাধ্য হয়েই। বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে অগ্রসর হলেই যে কেউ সুচিন্তিতভাবে কাজ করতে পারে এমনটি নয়। প্রকাশককে অসন্তুষ্ট করে সম্পাদক যেমন কাজ করতে পারে না,  উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিরুদ্ধে গিয়েও নিম্নবিত্তরা ভালো অবস্থানে সহজে পৌঁছতে পারেন না এবং সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখেন না।

সীমাহীন ক্ষমতা থেকে জন্ম নেয় স্বেচ্ছাচারিতা,  ক্ষমতাবানের অধীনস্থতা থেকে তৈরি হয় সীমাবদ্ধতা। মুক্ত মানুষ তিনিই যিনি স্বক্ষমতার উন্নয়ন ঘটিয়ে স্বাধীনতার পরিসর বাড়িয়েছেন। যার সামাজিক মর্যাদা নেই, রাজনৈতিক অধিকার নেই, বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করতে হয়, মত প্রকাশের  স্বাধীনতা নেই, বিচরণের স্বাধীনতা নেই- সে স্বাধীন মানুষ নন।  সম্পূর্ণভাবে মানুষের আজ্ঞাবহ হয়ে জীবন যাপনে মানুষেরই অপমান হয়। তাই কাউকে পিয়ন, কাউকে ঝাড়ুদার, কাউকে চাকর, কাউকে দাড়োয়ান হিসেবে নয়; মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতে শিখুন! মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না, ও বন্ধু। শুধু গানটি শুনে আবেগাপ্লুত না হয়ে সত্যিকারার্থেই সবাইকে শ্রদ্ধা করুন। সকল পেশার মানুষকে ভালোবাসুন, কাউকে অবহেলা বা ছোট করবেন না। অধীনস্থদের সাথেও সদাচরণ করুন। আপনার একটু ভালোবাসাই পারে নিঃস্ব, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে। অন্যের মুখে হাসি ফোঁটাতে পারাই আপনার কাছে সবচেয়ে আনন্দের কাজ হওয়া উচিৎ।  অবশ্যই বৈষম্য চর্চা বাদ দিতে হবে সুবিধাভোগীদের, আনন্দ ও পূর্ণতায় ভরে উঠাতে অনেকের জীবন।

 

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ [email protected]

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।