ব্রেকিং নিউজ :
September 13, 2017

নাম্বার ওয়ান সাকিবের বিশ্রাম ভাবনা ও আক্ষেপ  

শরীরের ওপর জোর করা চলে, মনের ওপর নয়। সিনেমার ডায়লগ বলতে পারেন বা বাস্তবতা, সাকিব আল হাসানের বিশ্রাম নিয়ে আপাতত এটিই ট্যাগলাইন!

কেউ যদি বিশ্রাম চেয়ে বসে, তখন আসলে বিশ্রাম না দিয়ে আর উপায় থাকে না। কারণ জোর করে আর যাই হোক, ক্রিকেট খেলা হয় না। সবসময়ই বলি, ক্রিকেটের মত সাইকোলজিকাল খেলা আর নেই। ক্রিকেট যতটা শরীরের খেলা, তার চেয়ে অনেক বেশি মন আর মাথার। কাজেই সাকিব অফিসিয়ালি বিশ্রাম চাওয়ার পর দিতেই হতো।

বোমটা ফেটেছে হয়ত দুম করেই। তবে তার পরিকল্পনা অনেক দিনের। নানা সময়ে এটা নিয়ে ভেবেছেন। টুকটাক আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে নানা সূত্র থেকে যতটা জেনেছি , ক্লান্তি-শ্রান্তিতে টেস্ট থেকে ২-১ বছরের বিরতি নেওয়ার কথাও নাকি ভেবেছেন কখনও কখনও।

সেটির কারণও ছিল। তার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় ইনজুরি যেটি, সেটি হয়েছিল স্ট্রেস থেকেই। শিন বোন ক্ষয়ের মত হয়েছিল অতিরিক্ত চাপে। সতর্কতায় সেটি ওভারকাম করা গেছে। ২০১২ সালে শিনবোন ইনজুরিতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ খেলেননি।

২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কায় খেলতে পারলেন না। তখন ছিল তিনটি সমস্যা। কাফ মাসলে ইনজুরি। বাকি দুটিই ছিল স্টেস রিলেটেড। স্ট্রেস রিঅ্যাকশন টিবিয়া ও এক্সারশনাল কম্পার্টমেন্টাল প্রেশার সিনড্রোম (ভুল করিনি আশা করি!)। কাফ মাসলে অপারেশন হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। বাকি দুটি ওভারকাম করা গেছে সময় নিয়ে।

২০১৫ সালে আবার শিন বোনে ব্যথা। সেটির কারণে সেবার খেলতে পারেননি জাতীয় লিগে।

একটা ব্রেকের ভাবনা তাই সাকিবের বেশ আগে থেকেই ছিল। আজকে সাকিব বলেছেন, তার ভয় হয় এভাবে চলতে থাকলে ২-১ বছরের বেশি খেলতে পারবেন না। শুনে শিউরে উঠতে হয়। আমি স্বপ্ন দেখি, ভারতে ২০২৩ বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ে সাকিব আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। ওয়াংখেড়ে বা ইডেনে উঁচিয়ে ধরবেন ট্রফি। তাই সকিব যখন বলেন যে আরও ৫-৬ বছর খেলতে একটি ব্রেক তার জরুরী, তখন মেনে নিতেই হয়।

ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি থেকে কেন নয়, কেন টেস্ট থেকেই বিশ্রাম … এটির ব্যখ্যাও আজকে সাকিব দিয়েছেন। দুটি টেস্ট ম্যাচ মানে কেবল পাঁচ-পাঁচ দশদিন নয়। প্রস্তুতি ম্যাচ, তার আগের প্রস্ততি মিলিয়ে মাসখানেকের ধাক্কা। এবারই যেমন দুটি টেস্টের আগে প্রস্তুতি ছিল দুই মাসের। ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি সিরিজে ধকল এতটা থাকে না। যুক্তি মানার মতোই।

শ্রীলঙ্কার সীমিত ওভারের অধিনায়ক হওয়ার পর উপুল থারাঙ্গা কদিন আগেই ৬ মাসের বিরতি নিয়েছেন টেস্ট থেকে। থারাঙ্গা বিশ্ব জুড়ে টি-টোয়েন্টি লিগগুলোর ‘হট কেক’ নন। তবু নিয়েছেন বিরতি। এবি ডি ভিলিয়ার্স ইনজুরি নিয়ে সিপিএল খেলতে গিয়ে সেটি আরও বাড়িয়েছেন। দেশের হয়ে টেস্ট খেলছেন না দেড় বছরের বেশি হয়ে গেলো। সামনে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন, তবে বাংলাদেশ সিরিজেও খেলবেন না। গেইল-ব্রাভো-নারাইনরা শুধু টি-টোয়েন্টি লিগগুলোয় ইচ্ছেমত খেলার জন্য দেশের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে সই করেন না বছরের পর বছর। নজীর তাই অনেক আছে। সাকিব প্রথম নন। ওই কাতারেও নন। তুলনা করলে বরং সাকিব একটু ভালোই!

তার শরীর, তার মনকে সবচেয়ে বেশি ভালো জানেন তিনিই। একবার যদি মন উঠে যায় ক্রিকেট থেকে, খেলার আনন্দটা যদি হারিয়ে যায়, যদি শতভাগ উপভোগ করতে না পারেন, তাহলে শরীরের ওপর হাজার জোর করলেও পারফরম্যান্স বের হবে না।

আজ হোক বা কাল, এই ব্রেক তার নিতে হতোই। একটি-দুটি সিরিজ সাকিবকে ছাড়া আমাদের খেলতে হতোই। কোনোটাতেই তাই আমার আপত্তি নেই। সব বাস্তবতাই উপলব্ধি করতে পারি। রেস্ট তাকে দিতে হতোই। সবই ঠিক আছে। আমার শুধু একটি জায়গাতেই বিস্ময়। প্রশ্ন। আপত্তি। কিংবা একমত নই। সেটা হলো টাইমিং। এই সময়টা। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরই কেন বাদ !?

৯ বছর পর আমাদের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। একেকটি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকা সফর হলো একেকটি ল্যান্ডমার্ক। কিছু করে দেখানোর সুযোগ। প্রমাণ করার সুযোগ। নাড়া দেওয়ার সুযোগ। দলীয় ভাবে যেমন, ব্যক্তিগত ভাবেও। এই দেশগুলোর ক্রিকেট মহলের বাস্তবতা হলো, তাদের বিপক্ষে ভালো করলেই কেবল তারা নাড়া খায়। নইলে পাত্তা দিতে চায় না। আর দক্ষিণ আফ্রিকা সফর বরাবরই উপমহাদেশের সব দলের জন্যই ক্রিকেট বিশ্বের কঠিনতম পরীক্ষা। এখানে ভালো করলে গোটা ক্রিকেট বিশ্বকেই জানান দেওয়া হয়।

সাকিব না থাকা মানে বাংলাদেশের ভালো করার সুযোগ কমে যাওয়া। তার নিজেরও হারানোর আছে অনেক কিছু। ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটাচ্ছিলেন। দারুণ রিদমে ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ভালো কিছু করলে বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা আরও পোক্ত হতো। গ্রেটদের কাতারে ভীড় ঠেলে বেশ দূর এগিয়ে যেতেন।

সেটি হলো না। আবার কবে হবে, সেটির ঠিক নেই। ক্যারিয়ারে আদৌ সাকিবের আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট খেলতে যাওয়া হবে কিনা, নিশ্চিত নয়। একজন ক্রিকেট সাংবাদিক হিসেবে,আর সাকিবের সামর্থের বড় ভক্ত হিসেবে আমি হতাশ। আমার খারাপ লেগেছে।

যেখানে কন্ডিশন যত প্রতিকূল, চ্যালেঞ্জ যত কঠিন, আমার প্রিয় একজন ক্রিকেটার, আমার দেশের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার সেই চ্যালেঞ্জ কিভাবে সামলান, কিভাবে সেটির জবাব দেন, আমার তা দেখার প্রবল কৌতুহল ছিল। অপেক্ষায় ছিলাম। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাকিবের না যাওয়া তাই আমার হজম করতে কষ্ট হচ্ছে।

আমার খুব ভালো লাগত, সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পর বিশ্রাম চাইলে। খুব ভালো লাগত, যদি সাকিব এবার বিপিএল না খেলতেন। টি-টোয়েন্টি হলেও এক মাসের বেশি সময়ের ধাক্কা। অনেক অনেক ম্যাচ।

সাকিব এটিরও জবাব দিয়েছেন। টি-টোয়েন্টি লিগগুলোয় তিনি হলিডে মুডে থাকেন। চাপ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার পরই কেন বিশ্রাম নয়? তার জবাব, “আমার কাছে যদি মনে হতো যে পরে নিলেও চলবে, তাহলে পরেই নিতাম। আমার কাছে মনে হলো, এখনই বিশ্রামের উপযুক্ত সময়। এ কারণেই নেওয়া।” এটা বলার পর আর কিছু বলার থাকে না। তার মন যদি আর এই মুহূর্ত থেকে আর মাঠে থাকতে না চায়, তাহলে সেই মুহূর্ত থেকেই সরা ভালো। শরীরকে পুশ করা যায়, মনকে নয়।

এভাবে মনের দাবী শোনা, সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করিও তার পক্ষেই সম্ভব। বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক প্রায় অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করেছেন। তার যা ধরণ, সেটিকে আমাদের সমাজ সাধারণ মানতে চায় না। এক কথায় বেয়াদব বা অহংকারী বলে তকমা লাগিয় দেয়। তিনি সেসবে কান দেননি। বরং তার মতো থাকাও যে একটা “ধরণ”, এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন বছরের পর বছর। অল্প করে হলেও লোকে বুঝতে পারছে। তো এই দেশে, যেখানে সমালোচনা হয় পান থেকে চুন খসলে, যেখানে তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন সবার “অধিকার”, যেখানে তাকে প্রবল সমালোচনা করা হয় নানা কারণে নিত্য, সেই দেশ বা সমাজে তিনি তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার কথা ভাবতে পেরেছেন, এটাও তিনি সাকিব বলেই সম্ভব। জানেন অনেক সমালোচনা হবে, শূলে চড়ানো হবে, ঝড় উঠবে। তবে সেটাকে সামলানো বা উপেক্ষা করার গাটস তারই আছে।

আজকে তিনি তার অবস্থান ব্যখা করেছেন, যুক্তি দিয়েছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, বুঝিয়েছেন। আমি তার সব কথার সঙ্গে একমত নই। তবে যেটা বললাম, তিনি বলেই সম্ভব। তিনি বলেই পেরেছেন।

এটাও আশা করি, ফেরার পরও তিনি পারবেন। ক্যারিয়ারের দারুণ সময়ে হঠাৎ বিরতি তার ছন্দপতন ঘটাবে না। রিদম-মোমেন্টাম ফিরে পেতে লড়াই করতে হবে না। এমনিতে যে কারও হওয়ার কথা সমস্যা। তবে তিনি জিনিয়াস। তিনি “ফ্রিক”। আশা করি তার সমস্যা হবে না।

শেষ করছি তিনটি অনুভূতির মিশ্রনে।

প্রথমত: হতাশা। আবারও বলছি, দক্ষিণ আফ্রিকার চ্যালেঞ্জের জবাব এই সেরা সময়ের সাকিব কিভাবে দেন, সেটি দেখা হলো না। ভীষণ হতাশার।

দ্বিতীয়ত, আক্ষেপ। সাকিবের জবাবের পরও আক্ষেপ, এবার বিপিএলটাও তো বাদ দিতে পারতেন!

তৃতীয়ত, একটি চাওয়া। ক্যারিয়ারের বাকি পথচলায় আশা করি

বিপিএলসহ ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টিগুলোও বেছে বেছে খেলবেন….!

Ariful Islam Roney, Senior Cricket Correspondent at bdnews24.com

ফেইসবুক পোস্ট

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ bangladesh24online.news@gmail.com

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।