ব্রেকিং নিউজ :
October 15, 2017

মাভাবিপ্রবিঃ নাবালক থেকে সাবালক ও আমাদের প্রাপ্তি

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক ও মানসম্মত উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর আমৃত্যু সংগ্রামের চারণভূমি টাংগাইল জেলার সন্তোষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর।  ২০০১ সালের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পাশ হয়।

দ্বিতীয় প্রকল্প পরিচালক হিসেবে অধ্যাপক ড. আমিনুল হক ২০০২ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই জন প্রকল্প পরিচালক ও পাঁচ জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেন। অনেক বাধাঁ-বিপত্তি এড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অগ্রগতিতে বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোঃ আলাউদ্দিনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বয়সের দিক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি নাবালক থেকে সাবালকে পরিণত হলেও আসলেই কি সাবালক হলো?  আর আমরা কি পেলাম?

সাম্প্রতিক ঘটনাসমুহ আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত করেছে। আবারও বহিরাগত সন্ত্রাসী হামলার স্বীকার হলো মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বহিরাগত হামলা এখন প্রতিদিনকার ঘটনায় পরিনত হয়েছে। প্রতিবারই যখন কাউকে আঘাত করা হয় তখন আশেপাশে থাকা সহপাঠী কিংবা স্থানীয় লোকজন একত্রিত হয়ে সার্কাস দেখার মত দর্শকের ভূমিকায় অধীর আগ্রহে আঘাতের দৃশ্য উপভোগ করে। আর বিজ্ঞানের কল্যাণে ছবি তোলা ও ভিডিও করা নিয়ে লেগে যায় হুলস্থুল কাণ্ড। হয়তো পারলে দৃশ্য দেখার পর সন্ত্রাসীদেরকে তালি বাজিয়ে বাহবাও দেয় অনেকে। এ কেমন আবেগ, কেমন মানবিকতা আমাদের!

ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল পরতেই আমাদের আবেগ, মনুষ্যত্ব, মানবিকতার চরম ঘাটতি অবলোকন করছি। বিজ্ঞান আমাদের  দৈনন্দিন কাজের গতি বাড়িয়েছে, দিয়েছে স্বস্তির নিঃশ্বাস, বাড়িয়েছে কর্মসাফল্য। কিন্তু আবেগ, মনুষ্যত্ব, মানবিকতায় বারণ করেছে কী? বিখ্যাত লেখক যাযাবর অনেক আফসোস করে বলেছিলেন, “আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাতে আছে গতির আনন্দ, নেই যতির আয়েশ।” আবেগই একটি মানুষের মূল চালিকা শক্তি। পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে আবেগ দিয়েই মানুষ যত কিছুর সৃষ্টি বা ধ্বংস করেছে।

লর্ড ক্লাইভ তার ব্যক্তিগত ডায়েরীতে পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাদেরকে এভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এবং যখন গলায় ছেঁড়া জুতোর মালা দিয়ে অপমান করা হয় তখনও বিনা টিকিটে দৃশ্য দেখার মানুষ ছিল অহরহ। শুধু তাই নয়, পিঠে ছুরি মারার পূর্বে যখন কাঁটাযুক্ত সিংহাসনে বসানো হয় তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখেছে অনেকে। উপস্থিত মানুষগুলো যদি একটি করে ঢিলও ছুঁড়ত তাহলেও হয়তো ইতিহাস ঘুরে যেত বলে ক্লাইভের মূল্যায়ন। যাই হোক মূল কথায় আসি।

প্রনব-রানা-মুহিতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। আর ঘটবেই বা কেন? আমাদের ইতিহাসটাই তো এরকম। আশেপাশে থাকা সহপাঠী, দোকানদার ও স্থানীয়রা সকলেই দাড়িয়ে দাড়িয়ে বিনা টিকিটে তামাশা দেখেছে। মনে হয় সিনেমার সুটিংয়ে দর্শকে হাউসফুল। কেউ কি ভেবেছেন কতটা উজবুক হলে এমন দৃশ্যে প্রতিহতের ভূমিকায় অভিনয় করার মত কেউ এগিয়ে না গিয়ে পারে? অত্যন্ত কষ্ট ও পরিতাপের বিষয় হলো, একজন উপজেলা শিক্ষা অফিসার, একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তারা কিভাবে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে শহরের হাজার দর্শকের (জনতার) মাঝে লাথি মেরে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক লাঠিপেটা করে।

পুলিশে সোপর্দ করে চোর, গুন্ডা, মাস্তান বলে। যেখানে শিক্ষিত সমাজের শিক্ষকরাই আজ বড় সন্ত্রাসী সেখানে অশিক্ষিত, উগ্র সন্ত্রাসীরা তো অনেক নিচের স্তরের। লজ্জায় আমার মাথা হেট হয়ে যায় যখন দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এহেন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিছু করতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালায়ের ছাত্ররা বার বার বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলার স্বীকার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদী কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অপরাগ বলে মনে করি না। বিচারের আশা করেছি কিন্তু পাইনি। আজ পর্যন্ত “বহিরাগত ইস্যুতে” বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি। আসলে এতে তাদেরই বা দোষ কোথায়? দোষতো এই সমাজের, বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় আধুনিক এই মানবের। বার বার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বহিরাগত হামলার স্বীকার হওয়ায় একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে ঠিক তেমনি উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের রোষানলে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককেও অকথ্য ভাষায় গালি গালাজসহ অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকারও হতে হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে এমন আচরণ তার প্রাপ্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক কেন প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাবেন? তিনি থাকবেন গবেষনা নিয়ে, তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত হবেন। একজন শিক্ষক দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন। তারা একটি জাতি গঠনের হাতিয়ার। তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। একজন শিক্ষকের নিজ পেশার স্বার্থে তাকে নিত্য নতুন জ্ঞান ও কৌশল অর্জনের সন্ধানে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সে সময়টুকু আমাদের দেশের শিক্ষকরা কি আদৌ পেয়ে থাকেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দাবি পূরণ, তাদের মাঝে গ্রুপিং সৃষ্টি, কে কার সাথে মারামারি করল, এগুলো নিয়ে তো তার সময় নষ্ট করার কথা নয়। এত কিছুর মাঝে কখন সে তার নিজের গবেষনায় সময় দিবেন আর কখনই বা তার গবেষণারত ছাত্রদের সময় দিবেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ে চুরির ঘটনাও নতুন নয়। কিন্তু সম্প্রতি ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবন ও নব-নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান হলে চুরির ঘটনা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর আগেও বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের আসবাবপত্র চুরি হয়েছে, ক্যাম্পাস থেকে পানি তোলার মটর চুরি হয়েছে, ল্যাব থেকে যন্ত্রপাতি চুরি হয়েছে। কিন্তু একটিরও সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি, বিচার হয়নি। কিন্তু কেন?

উদ্ভুত সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের যে তৎপরতা দরকার তার অভাব রয়েছে। প্রথমত প্রয়োজন নিজের ঘর ঠিক করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত ঐক্য গঠন করা। ইস্পাত কঠিন ঐক্য না হলে অদূর ভবিষ্যতেই এর চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। যেটা কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গ্রুপ, গোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের নয়, সেটা হবে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের।

মাত্র তিনদিন হলো বিশ্ববিদ্যালয় নাবালক থেকে সাবালক হয়েছে। গত ১২ ই অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯ এ পদার্পন করেছে। আর এখন যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তরিকতার সাথে সকলের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বসহকারে আমলে নিয়ে, সকলের সম্মিলিত প্রয়াস ঘটাতে পারে তাহলেই আমরা প্রকৃতপক্ষে সাবালক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবো। একইসাথে সাবালক হয়ে হাজার বছর টিকে থাকার প্রত্যয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করবে স্বপ্নের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড.মোঃ আলাউদ্দিনের কাছে। অন্যথায় সাবালক হয়েও রয়ে যাবো নাবালক।

লেখক মোহাইমিনুল কাইয়্যূম, শিক্ষার্থী মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ bangladesh24online.news@gmail.com

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।