ব্রেকিং নিউজ :
November 1, 2017

করুণায় হ্যাঁ, অধিকারে না!

আনিসুর রহমান এরশাদ

কী অদ্ভূত আমরা, কী অদ্ভূত আমাদের সমাজ! এখানে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক মানুষ। বঞ্চিত করছেন কারা?  নিকটজন, পরিচিতজন, কাছের মানুষরাই, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই। আমি দেখেছি ভাই-বোন খুব ভালো সম্পর্ক, কিন্তু বোন পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ চাইলেই ভাইয়ের হাসিমুখ কালো হয়ে যায়।

অনেক মালিকই হজ শেষে দেশে ফিরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে খেজুর-জায়নামায-জমজমের পানি বিলানোর আন্তরিকতা দেখাতে পারেন কিন্তু বেতন-বোনাস-পদোন্নতি-চাকরি স্থায়ীকরণের ন্যায্য অধিকারের দাবি করলেই সেই হৃদ্যতা আর থাকে না। ন্যায্য অধিকারের দাবি যদি আন্দোলনে রুপ নেয় তবে মিষ্টি কথার মানুষটিই দমন-নিপীড়নের পথে যান; লাগে ইন্ডাস্ট্রিয়্যাল পুলিশও।

যাকাতের টাকা বা কাপড় বিলানোর এমন সদিচ্ছা যে পদপিষ্ট হয়ে মারাও যায়! দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে আসা মানে তাদের প্রতি করুণার বিষয় নয়, অভাবীদের হক পূরণ করা স্পষ্ট সামাজিক দায়িত্ব। অধীনস্তদের অধিকার হচ্ছে ভালো আচরণ পাওয়া। অথচ কর্তা-বস ন্যায়পন্থী না হওয়ায় গৃহ থেকে শুরু করে অফিসে অধিকার ক্ষুণ্ন হতে থাকে অবিরত।

শ্রমিক সময় মতো বেতন পায় না, গৃহকর্মী অসুস্থ শরীরেও বিশ্রামের জন্য ছুটি পায় না, পিয়ন ভুল না করেও ঝাঁড়ি খায়, দাঁড়োয়ান নিকটজনের জানাযায়ও শরিক হবার সময় পায় না। সন্তান প্রসবের কারণে কয়েকদিন কারখানায় যেতে না পারার কারণে নতুন নারী কর্মী নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে; কর্তৃপক্ষ মা ও সদ্যজাত সন্তানকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। অন্তস্বত্তা মায়ের যে শ্রম-ঘাম-রক্ত প্রতিষ্ঠানটির সাথে জড়িয়ে আছে, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত নারীর যন্ত্রণা-দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে; তার মূল্যায়ন করতে পারেনি অবিবেচক কর্তৃপক্ষ। যথাযথ পারিশ্রমিক দেয়াতেই বৃহত্তর লাভ, ঠকানো-প্রতারণা-কম দেয়ায় বেশি লাভ মনে হলেও আসলে ক্ষতি!

অনেকেতো এত বড় জালিম যে বাবা-মা যেখানে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা-সম্মান পাবার হকদার; তাদেরকেও অসুস্থ হলে দেখতে যায় না, এমনকি ঈদ উপলক্ষেও যোগাযোগ করে না। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম যখন শুনেছিলাম ছেলে সুযোগ থাকার পরও বাবার জানাযায় পর্যন্ত শরিক হয়নি; পরিবারটি আমার পরিচিত। এই যদি হয় অবস্থা তবে অধীনস্ত-গরিব-দুর্বলেরও যে উন্নত আচরণ পাবার অধিকার আছে তা’ তাকে বলে কী লাভ হবে! যে অন্যের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারে না, তার নিজের সম্মান পাবার কোনো অধিকার নেই। যে মানুষগুলো নিজের পাওনা-অধিকার ষোলো আনা আদায় করেন অথচ অন্যের যৌক্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন; তারা মানবিক দিক থেকে দুর্বল আর নৈতিক দিক থেকে পঙ্গু।

আপনার যদি একটিই জামা থাকে তবে যার একটিও জামা নেই তাকে আপনি জামাটি দিতে পারবেন না। কিন্তু যদি দু’টি থাকে তবেই সে একটি পাবার হকদার। এরকম আপনার পেট যদি ভরা থাকে আর আপনার কাছে যদি খাবার থাকে তবে ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়া আপনার দায়িত্ব হয়ে পড়ে। এটা মানবিক স্তর; এর নীচে পাশবিক স্তর। নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানো, নিজে না পরে অন্যকে পরানো আরো উন্নত স্তর। সবাই আবু বকরের মতো আল্লাহ-রাসুলকে নিজের জন্য রেখে সবকিছু বিলিয়ে দিতে পরেবেন না, হাজী মুহম্মদ মহসীন হতে পারবেন না; কিন্তু নিজের সাধ্য-সামর্থ্যানুযায়ী বাবা-মাকে খাওয়াতে পারেন, কাজের মেয়েকেও নিজের মেয়ের মতো জামা-কাপড় দিতে পারেন।

আপনি বৈষম্য চর্চা ছাড়ুন, সমাজ থেকে বৈষম্য কমে যাবে। আর অন্যের মুখের গ্রাস কেড়ে খাওয়া, পেটে লাথি মারা বা আত্মসাৎ করাটা পাশবিক স্তরেরও নীচে। অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন, আপনার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হবে। আপনি যখন অন্যের অধিকার মনে করে বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করবেন, রোগাক্রান্তের সেবা করবেন, নি:স্ব-অসহায়ের পাশে দাঁড়াবেন তখন তাকে ছোট-তুচ্ছ-ক্ষুদ্র মনে হবে না। করুণাপ্রার্থী বা করুণা পাবার হকদারকে করুণা না করলেও আপনি ততটা অপরাধবোধে ভুগবেন না কিন্তু অন্যের অধিকার আপনার দ্বারা ক্ষুণ্ন হয়েছে ভাবলে আপনার ক্রমোন্নতি ঘটবে। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আপনার কাজে-আচরণে ভিন্ন প্রভাব পড়বে। যার যা অধিকার তা তাকে দিন, করুণার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। একজনের করুণা-দয়া আরেকজনের মাঝে হীনমন্যতা তৈরি করে আর অধিকার প্রতিষ্ঠা আত্মবিশ্বাস-আত্মসম্মানবোধ বাড়ায়।

এই যে করুণার চোখে দেখার মানসিকতা এটা শুধু বাংলাদেশিদের মাঝে আছে এমনটি নয়। যেসব দেশের আকাশচুম্বী ভবনের প্রতিটি ইট সাক্ষী, এসবের ভিতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ঘাম। সেসব দেশের সাহেবরা এসব খেটে খাওয়া মানুষদের ভিখারির চেয়ে ভালো কিছু মনে করে না। দেশ ছেড়ে পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা গরিব অসহায় মানুষগুলোকে ঠকিয়ে অনেকেই দামি গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ায়, অট্টালিকায় রাত যাপন করে‍। অথচ এসবের বিনিময়ে এদের ভাগ্যে জোটে কেবলই অপমান আর লাঞ্ছনা। এসব প্রবাসীরা করুণা নয়, প্রাপ্য সম্মান চায়। দয়া-কোন কাজে কারো অপরাগতার প্রেক্ষিতে সাহায্য করা। করুণা-নিজের অবস্থানে থেকে অন্যের কষ্টে সামান্য পরিমাণের সহমর্মিতা প্রদর্শন। অনুগ্রহ- চেষ্টায় কারো নিকট হতে সাহায্য পাওয়া। দয়া, করুণা, কৃপা, আনুকূল্য, অনুকম্পা, বদান্যতা, পর দুঃখ মোচনের আকাঙ্খা,  উপকার করণ এবং  অনুগ্রহ মুলত সমার্থক শব্দ। এর একটির দ্বারা আর একটির অর্থ বোঝায়।

যত বেশি ভালোবাসবেন, যত বেশি অধিকার দিবেন-ততবেশি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবেন; যতবেশি করুণা করবেন বা করুণাপ্রার্থী হবেন ততবেশি মানুষের সম্মান নষ্ট করবেন। করুণাপ্রার্থীর প্রতি অবশ্যই  করুণাহীন হবেন না; যার যার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে করুণা করারই প্রয়োজনই কমে যাবে। অন্যদের যত্ন নেওয়া, সাহায্য করা, প্রয়োজনে সহযোগিতা করা, শুধু মুখে মুখে নয় কাজের মাধ্যমে অন্যদের মঙ্গল কামনাকে বাস্তবায়ন করা, সমবেদনার কোমল অনুভূতি রেখে সাহায্য করার প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। কোনো অসুস্থ ব্যক্তির জন্য খাবার প্রস্তুত করা, বয়স্ক ব্যক্তিকে ঘরের টুকিটাকি কাজ করতে সাহায্য করা, প্রয়োজনের সময়ে তাদের গন্তব্যে নিয়ে যেতে পরিবহণের ব্যবস্থা করা এবং যোগ্য ব্যক্তিদের প্রতি কৃপণ না হওয়া খুবই ভালো। আপনি এসব করবেন কিন্তু ভাববেন এসব করে আপনি তাকে করুণা করছেন না বরং আপনি আপনার দায়িত্বটুকু পালন করছেন মাত্র।

যখন কেউ বিধবা, এতিম, তালাকপ্রাপ্ত, অনাথের সহযোগিতা করবে এবং পিছিয়ে থাকা মানুষকে উৎসাহিত করবে তার এটা ভাবলে ঠিক হবে না যে আমি না থাকলে তো শেষ হয়ে যেতে। উপকারীর অকৃতজ্ঞ হওয়া যেমন ঠিক নয়; তেমনি উপকার করে অহঙ্কার করা বা খোটা দানও সঠিক কাজ নয়। যখন যার প্রয়োজন হবে তখন তার যত্ন নিতে হবে; কী পেলাম কী পেলাম না সে হিসাব কষলে হবে না। কেউ আপনার সাহায্যপ্রার্থী হলে নিজেকে হনুরে ভাববেন না বরং ভাববেন মানুষের উপকার করার সুযোগ পেয়ে আপনি স্রষ্টার কাছাকাছি হবার সুযোগ পেলেন। অর্থাৎ সে আপনাকে ক্ষুদ্র ত্যাগের বিনিময়ে বৃহৎ কিছু পাবার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করলো; উপকার গ্রহণ করেও আপনার বড় উপকারই করে গেল।

এভাবে ভাবলে মানসিক প্রশান্তি-তৃপ্তি বেশি পাবেন; অন্যকে নিজের কাছে ঋণী মনে হবে না বরং নিজেকেই অন্যের কাছে ঋণী মনে হবে। এতে  কোনো হিসাব-নিকাশ ছাড়াই সময়, প্রচেষ্টা ও সম্পদ অন্যের কল্যাণে স্বেচ্ছায় ব্যয় করার মানসিকতা তৈরি হবে। অন্যদের সঙ্গে পক্ষপাতহীনভাবে আচরণ করতে পারা উত্তম মনোভাবের বহি:প্রকাশ। সমাদরের বা স্বীকৃতি লাভের যোগ্য সেসব ব্যক্তিরাই যাদের মন দয়ায় পরিপূর্ণ, মুখ থেকে ধন্যবাদ বের হয়, হৃদয়ে তিক্ততা ও ঈর্ষা নেই, সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, ক্ষতিকর-অনর্থক কথাবার্তা বলে না, খারাপ চিন্তাও করেন না, নিজেকে না পারলেও অন্যকে ক্ষমা করতে পারেন, শান্তিপ্রিয় হয়।

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ bangladesh24online.news@gmail.com

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।