ব্রেকিং নিউজ :
November 9, 2017

ঠোঁট-বক্ষ-নিতম্ব নয়, মন-মগজ-চরিত্রকে গুরুত্ব দিন

শাওন মুকুল

পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হতে নারী শরীর প্রদর্শন করছে, পুরো শরীর জুড়ে প্লাস্টিক সার্জারি করাতে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ সম্প্রসারণে ইনজেকশন ব্যবহার করছে, সুগঠিত নিতম্ব পেতে দশ থেকে তের হাজার মার্কিন ডলার খরচ করে নিজেকে ছুঁড়ি কাঁচির নিচে সঁপে দিচ্ছে, পেট থেকে চর্বি নিয়ে নিতম্বে জোড়া দিচ্ছে; আর ভাবছে নারীর স্বাধীনতা বেড়েছে।

ঠোঁট-বক্ষ-নিতম্ব প্রদর্শন করে জনপ্রিয় হতে চেয়ে নারীরা নিজেদের বিভিন্ন অঙ্গ ছোট-বড় করছেন।  আপনি অভিনেত্রী, গায়িকা ও মডেল  যেই হোন না কেন; অনেকেই মনে করেন না যে- দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ছোট-বড় আকারের বানানোর মাধ্যমে আপনার মুক্তি মিলেছে।

যে নারী উন্নত শরীরের প্রয়োজনে এসব করছেন, সেই নারীর জন্য তো পুরুষকে নিতম্ব বড় করাতে দেখা যায় না। মেয়েরা লম্বা এবং সুঠাম দেহী পুরুষকে পছন্দ করলেও আয়-সামাজিক অবস্থান-যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দেন। আসলে ব্যায়ামাগারে নারীদের নিতম্ব বড় করার ব্যায়ামের চাহিদা হুড়হুড়িয়ে বৃদ্ধি, সৌন্দর্য বাড়াতে ফোম দেয়া প্যান্টি পরা, নিতম্ব বড় করতে অস্ত্রোপচার প্রমাণ করে নারীর সম্মান-মর্যাদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ মেধা-দক্ষতা-যোগ্যতার চেয়ে শরীরই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

কেউ কেউ সস্তায় সার্জারি করতে গিয়ে বিভিন্ন জটিলতায় পড়লেও থামছে না এই চর্চা৷ অথচ অনেক পুরুষই মনে করেন ভারী নিতম্বে নারীর সৌন্দর্য বাড়ে না! তারপরও মেয়েদের দেহের সবচেয়ে চর্বিবৎসল অংশ নিতম্ব বড় করার নতুন ট্রেন্ডের শুরুটা যারা করিয়ে দিয়েছেন সেসব তারকারা নিজেদের জীবনে খুব কমই সুখী হয়েছেন৷ নিজের বাড়ন্ত নিতম্ব প্রদর্শন করে, নিতম্ব পুরোটাই নগ্ন করে ফটোশুট করে, নিতম্বের উপর শ্যাম্পেন গ্লাস রেখে সেটিতে বিশেষ কৌশলে শ্যাম্পেন ঢেলে  ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করা যায় কিন্তু নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ে না। ইন্টারনেটে উড়ে বেড়ানো ট্রেন্ডি ফটো নারীর লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে।

ঠোঁট জোড়া সুন্দর, মসৃণ, নরম ও টুকটুকে গোলাপি রাখতে চাওয়াটা দোষের নয়। ডিহাইড্রেশন, নিম্নমানের লিপস্টিক ব্যবহার, বেশি মাত্রায় চা কফি পান, ধূমপান, অ্যালার্জি, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, ঠোঁটে সরাসরি সাবান ব্যবহার করা, ভিটামিন এ, বি, সি এর অভাব এবং অতিরিক্ত রোদের প্রভাবে ঠোঁট শুষ্ক হয়ে ফেটে যায়। যাতে ঠোটের আদ্রতা হারিয়ে না যায়, সুন্দর ঠোঁট পাবার জন্য কেউ সঠিক যত্ন নিতেই পারেন।  সুন্দর হাসির জন্যে সুন্দর ঠোঁটের প্রয়োজনীয়তা আছে। নারীর সৌন্দর্যের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ হল তার ঠোঁট । সুন্দর ঠোঁট তাকে করে তোলে আরো সুন্দর, হাসির প্রাণ হলো ঠোঁট। ঠোঁট দেখে ব্যক্তিত্ব, মানসিকতা, মন-মেজাজ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। ঠোঁটের বর্ণ কালচে বা ঠোঁটে কালো কালো দাগ পড়লে কালো ঠোঁট মুখের সৌন্দর্যকে অনেক খানি কমিয়ে দেয়। সবই বুঝলাম; তাই বলে প্লাস্টিক সার্জারি করতে হবে! মুক্তো ঝরানো হাসিমাখা মুখের প্রাণচঞ্চল উচ্ছল হাসিই কী সব!

অনেক সংস্কৃতিতেও নারীর স্তন নগ্ন রাখার প্রচলন  দেখা যায়। উন্নত সুডৌল বক্ষ পেতে নারীরা চায়, কারণ নারীর দেহে স্তন হল সৌন্দর্যের প্রতীক। যৌন তৃপ্তির প্রথম স্তর সুন্দর আকৃতির নিটোল স্তন। নারীর শরীরে স্তন বিকশিত এবং পুষ্ট হয় মূলত ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের সহায়তায়। অনেকে বক্ষ যুগলকেই নারীর শারীরিক সৌন্দর্যের মূলে  রয়েছে বলে মনে করেন। শিল্পীর তুলি থেকে লেখকের কলমে বারবার এই কথা উঠে এসেছে যে সুডৌল বক্ষ নারীর ভূষণ। ডায়েট, জিম করে সাইজ জিরো হওয়া এখনকার অনেক নারীদের লক্ষ্য হলেও, একথাই ঠিক নারীর আবেদন শুধু দৈনিক পরিপূর্ণতায় নয়। অনেকে শাররিক পরিপূর্ণতা পেতে ছুরি-কাঁচিরও সাহায্য নেন; অবস্থা এমন যেন যে নারীর স্তন পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় বিবেচিত হবে না সে নারীর জীবন ব্যর্থ।

নগ্নতা-যৌনতার এমন উন্মাদনা, নিতম্বের প্রদর্শনী, ফ্যাশন শোর নামে শরীর প্রদর্শন, সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে দেহকে পণ্য বানানোতে নারীর ক্ষতিই হয়েছে। লাভ হয়েছে ব্যবসায়ীদের, এসব অনেকের ব্যবসা বাড়িয়ে দিয়েছে৷ ফোম দেয়া প্যান্টির বিক্রি বাড়ছে হুড়হুড়িয়ে৷ শরীরকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করার দিকে সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে নারী নিজেকে আধুনিক সময়ের নব্য সফল পতিতা ছাড়া কিছু বানাতে পারবে না৷

মেয়েদের স্তনের বদলে নিতম্বের দিকে নজর দেয়াটা পরিবর্তনের এমন হাওয়া যে হাওয়া নারীকে তার অবস্থান থেকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামিয়েছে৷  আমার তো মনে হয় না- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্তনের বদলে নিতম্ব প্রদর্শনের যে চর্চা তার ভালো কোনো দিক আছে। যে তারকারা নিতম্ব প্রতিস্থাপন করেছেন তারা কি মনে করেন যে, জ্ঞানগত মেধা- আচরণগত যোগ্যতা- পেশাগত দক্ষতার চেয়েও শরীরের রং ও নানা অঙ্গের আকৃতি দিয়েই নারীর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণিত হয়।

দেহের যেকোন স্থানের চেয়ে নিতম্বের সংবেদনশীলতা তুলনামূলক কম হলেও অনেকেই এটিকে নারী শরীরের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ বলে মনে করেন, শরীরের সবচেয়ে সুন্দর অঙ্গ মনে করেন;তাই অধিকাংশ নারীই সুন্দর নিতম্ব-পাছা-পোঁদ  পেতে চান। মেয়েদের সেক্স উত্তেজনায় এর ভুমিকা রয়েছে, ছেলেদের আকৃষ্ট করায় এর অবদান অনস্বীকার্য। কেউ মানবদেহের যৌনসংবেদী এই অঙ্গটিকে বেশি পছন্দ করতেই পারেন, চাইতেই পারেন; তা তার ব্যক্তিগত অভিরুচি। তবে বিপরীত লিঙ্গ হিসেবে নারী শরীরের পুরোটাই পুরুষের জন্য আকর্ষণীয়। দেহটা নিরোগ হতে হবে, সুস্থ শরীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু প্রসাধনী সামগ্রী মেখে ফর্সা হতেই হবে, না খেয়ে স্লিম থাকতে হবে, প্লাস্টিক সার্জারি করে কৃত্রিমভাবে সৌন্দর্য বাড়াতেই হবে, পার্লারে বা স্যালনে গিয়ে ফেশিয়াল করাতেই হবে -এমনটা কেন হবে? দেহের রুপ-সৌন্দর্য  নিয়ে এত ভাবলে আপনি দেশ-জাতি-সমাজ নিয়ে ভাবা দূরে থাক, পরিবার নিয়ে চিন্তা-ভাবনারও সময় পাবেন না। যত্নের অভাবে যাতে আপনার মন না মরে যায়, আত্মা হারিয়ে না যায়; পুরুষের চোখে বেশি আকর্ষণীয় হওয়ায় জৌলুস নেই। তার মানে এটা নয় যে দীর্ঘদিনের অযত্নে আপনার ত্বক কালচে হয়ে যাবে, অবহেলায় কিছু কিছু জায়গায় ছোপ ছোপ দাগ পড়ে যাবে।

আসলে ইস্ট্রোজেন হরমোনের কারণে স্ত্রীদেহের নিতম্ব হয় অধিক মেদবহুল এবং টেস্টোস্টেরন হরমোনের কারণে পুংদেহের নিতম্ব হয় অধিক পেশিবহুল। সাধারণত নিতম্বের বিশেষ কোনো কার্য শরীরে নেই কিন্তু সোজা হয়ে বসে থাকার ক্ষেত্রে মাংসল নিতম্ব দুইটি সাহায্য করে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখায় দেখা যায়- ভারী নিতম্বের নারীরা পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত হন, সন্তান ধারণ ক্ষমতা বেশি থাকে এবং তারা সন্তান উৎপাদানে অন্যান্য নারীদের তুলনায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। ভারী নিতম্বের নারীদের জন্ম দেওয়া সন্তান বেশ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  কেননা ভারী নিতম্বের মহিলাদের উরু ও নিতম্বের চর্বি বাচ্চাদের মস্তিষ্ক বিকাশে বিরাট ভূমিকা পালন করে। নারী দেহের সকল স্থানের চর্বি তাদের সন্তানদের বুদ্ধিকে বিকশিত করা এবং তাদের ক্রম বিকাশে সহায়তা করে।

নিতম্বের ব্যাপারে গুরুত্বদানকারী অনেকে মনে করেন- ভারী নিতম্বের মহিলারা বেশি সুস্থ ও বুদ্ধিমতী হন; অন্যদের তুলনায় ক্রনিক অসুখ, কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা, ডায়াবেটিসে অনেক কম আক্রান্ত হন। কারণ এদের শরীরের নীচের অংশ উপরিভগের তুলনায় ভারী হওয়ায় শরীরে কোলেস্টেরল ও গ্লুকোজের পরিমাণ কম থাকে। যাদের শরীরের উপরিভাগ নীচের অংশের তুলনায় বেশি ভারী তাদের শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। নিতম্ব ভারী হলে শরীর ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণও বেশি হয়; যা সংক্রমণ রোখার অন্যতম হাতিয়ার।

অর্থাৎ কারো ভালো লাগবে কারো খারাপ লাগবে, সবার পছন্দ-অপছন্দ একইরকম হবে না। তাই বলে পুরুষের পছন্দের জন্য শুধু নারীকেই নিজের পছন্দ বিসর্জন দিতে হবে- এটা কেমন কথা। কেন সব সময় চর্ম চোখের দেখাই গুরুত্ব পাবে আর মনের চোখ বন্ধই থেকে যাবে। মেয়েরা লম্বা এবং সুঠাম দেহী পুরুষ এর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে কারণ তাদের সন্তানের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে শক্তিশালী পুরুষ। আধুনিক সময়ে শারীরিক শক্তির চেয়ে নিরাপত্তা শব্দটা যেহেতু টাকার সাথে যুক্ত হয়ে গেছে মেয়েরা অবচেতনভাবেই মোটা মানিব্যাগ বেশি প্রেফার করে। আসলে দেহের রং আর অঙ্গের আকৃতি নারী-পুরুষ কারোরই শ্রেষ্ঠত্ব বা গ্রহণযোগ্যতার নির্ণায়ক-মানদণ্ড হতে পারে না। ভদ্রতা-চরিত্র-যোগ্যতাকে বিবেচনায় নিতে হবে।

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ [email protected]

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।