ব্রেকিং নিউজ :
November 13, 2015

জিসানের গল্প

downloadশাওন মুকুল

জিসানের মনটা ভাল নেই। দাদুর আকস্মিক মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। খেলাধুলা, পড়াশুনা, খাওয়া-দাওয়া কোনো কিছুতেই যেন তার আগ্রহ নেই। জানালার গ্লাসে ফাঁক দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে ভাবনা মগ্ন হওয়া, মাঝে মাঝে দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না- কোনোকিছুই দৃষ্টি এড়ায় না মাজেদা বেগমের। জিসানের নেই চঞ্চলতা, দুষ্টুমি ; তাই আনমনে চুপচাপ বসে থাকা।

আজ জিসানের জন্মদিন। অথচ নেই প্রতিবছরের মত জমকালো অনুষ্ঠান, কোনোই আয়োজন। দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন প্রিয়জন হারিয়ে আনন্দ করতে ভুলে গেছে। একটি দুঃখদায়ক ঘটনার প্রভাব এতটাই শক্তিশালীভাবে ক্রিয়াশীল হয়েছে যে একটি পরিবারের স্বাভাবিক গতি থেমে গেছে। জিসানের দাদুর মৃত্যুর আজ পঞ্চম দিন।

জিসানের বাবা যোবায়ের চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জিসানের জন্মদিনটি আজ ভিন্নভাবে উদযাপন করবেন। পথ শিশুদেরকে খাওয়াবেন এবং অসহায় ভিক্ষুকদের সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ জন্য কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান না করে সরাসরি তাদের মাঝে গিয়ে, ঘুরে ঘুরে এ মনোবাসনা পূরণ করতে আগ্রহী তিনি। তাদের সাথে মিশে কথা বলে তাদের দুঃখ-কষ্টকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চান। আর তাদের মুখে হাসি ফুটাতে নিজ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে পিতার আত্মার মাগফেরাত আশা করেন।

বাসায় তিনি ইচ্ছে করলে মিলাদ কিংবা দু’আর আয়োজন করতে পারতেন। বড় কোনো হুজুরকে দাওয়াত দিতে পারতেন। কিন্তু তার পরিচিত কয়েকজন হুজুরের কার্যক্রমে তাদের প্রতি তার ভক্তি-বিশ্বাস কমে গেছে। যাদের নিজেদেরই কথা ও কাজে মিল নেই তারা কীভাবে অন্যকে পথ দেখাবে। নিজেই অন্ধকারে পথ হাতড়িয়ে যিনি মরেন অন্যকে পাপ মুক্তি তিনি কিভাবে করবেন। তাছাড়া ইদানীং জেএমবির ওৎপাত ও কিছু মাদ্রাসায় জঙ্গী প্রশিক্ষণের সংবাদে তিনি প্রচণ্ড বিরক্ত। তাই সওয়াবের জন্য তার প্রচলিত সিস্টেমের বাইরে ভিন্ন ধরনের চিন্তা।

জিসানকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন। সে তার একমাত্র পুত্র সন্তান। তিনি পুত্রকে উত্তম রূপে গড়ে তুলতে চান। তিনি চাননা তার ছেলে শুধু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেক অর্থ-সম্পদ আয় করে শুধু বড়লোক হন। তার প্রত্যাশা ছেলে হবে দেশপ্রেমিক, মানবসেবার ক্ষেত্রে দারুণ আগ্রহী। শুধু স্বার্থলোলুপতা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার সংকীর্ণ চিন্তা লালনকারীদের মানুষ; ভাবতেও তার কষ্ট লাগে।

ছোটবেলা থেকেই জিসানকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে চান তিনি। পরনির্ভরতা নয় স্বনির্ভর করে গড়তে তিনি জিসানকে শিক্ষা দিতে চান কোনোকিছুই এমনি এমনি পাওয়া যায় না অর্জন করে নিতে হয়। অনেকেই স্বাবলম্বী না হয়ে অন্যের উপর অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এটা দারুণ অপছন্দ যোবায়ের চৌধুরীর।

জিসান সফিউদ্দিন সরকার একাডেমী এ্যাণ্ড কলেজে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ছে। আলনা গোছানোর প্রতিদানে কলম কেনার টাকা, চাচাত ভাই ৪র্থ শ্রেণীর শুভকে পড়ালেখা শেখানোর মাধ্যমে স্কুলের বেতন, বাজার থেকে সদায়ের ব্যাগ বয়ে আনার কারণে প্রতিদিন নাস্তার টিফিনের জন্যে টাকা পায় জিসান। এভাবে জিসানকে সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে যোবায়ের চৌধুরী নানা ব্যবস্থাই নিয়েছেন।

বসে বসে চিত্তবিনোদন, শরীরচর্চা ও শারীরিক পরিশ্রমহীনতার কারণে, ফাস্টফুড প্রীতির কল্যাণে মুটিয়ে যাওয়া নগর জীবনের উঁচু শ্রেণীর পরিবারগুলোর ছেলে মেয়েদের সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা যাতে না হয় সেজন্য যোবায়ের চৌধুরী জিসানকে নিয়ে নিয়মিত ভোরে হাঁটেন, দৌড়ান। জিসানকে সাঁতার কাটতে, বাইসাইকেল চালাতে অভ্যস্ত করা হয়েছে। জিসানের সুস্বাস্থ্য, শারীরিক উন্নতির পাশাপাশি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার ব্যাপারেও যোবায়ের চৌধুরীর রয়েছে সজাগ দৃষ্টি।

জিসানের আগ্রহ, ঝোঁক প্রবণতার প্রতি যোবায়ের চৌধুরীর মনোযোগ রয়েছে। তার জন্য দেশত্ববোধক গান শুনা, বিতর্ক শুনা, বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখায় বাঁধা নেই। যোবায়ের চৌধুরী বড় মাপের ব্যবসায়ী। সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও সময় করে ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন শপিং মলে যান, পার্কে বেড়ান। ব্যতিক্রম হলো তিনি পথ শিশু, ভিক্ষুক, অসহায় মানুষগুলোকে দেখান। তাদের দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে বলেন, মাঝে মাঝে টাকা দিয়ে সাহায্য করেন। হাসপাতালে নিয়ে যান, রোগীদের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা দেখান। ছেলেকে কীভাবে সুস্থ থাকতে হবে এবং যারা অসুস্থ তদের সেবার মানসিকতা থাকার প্রয়োজনীয়তা বোঝান। জিসানের মনে মানুষের প্রতি মানবপ্রেম, গভীর দরদ সৃষ্টির জন্যেই যোবায়ের চৌধুরীর এই ব্যবস্থা।

যখন নজরুল ইন্সটিটিউটে যান গ্যালারি জুড়ে দেখান, লাইব্রেরী বিভিন্ন বইগুলো দেখান, নজরুল সম্পর্কে বলেন, তার সাহসিকতা ও পরিশ্রম সম্পর্কে বলেন। জিসানের মধ্যে ভাল, মহৎ গুণের সমারোহ ঘটাতে শুধু বিভিন্ন ব্যাপারে মুখের কথার পাশাপাশি কিছু বাস্তবে পর্যবেক্ষণ ও আনন্দদানের প্রসঙ্গটিও গুরুত্ব দেন চৌধুরী সাহেব। তাইতো তাকে নিয়ে যান জাতিসংঘ লাইব্রেরী দেখাতে দেখাতে জাতিসংঘের কথা বলেন, নজরুল লাইব্রেীতে বসেই নজরুল এর কথা শুনান, মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে যা বলা প্রয়োজন মনে করেন, বলেন-এরকমটা তার ভীষণ পছন্দ। যেখানে এরকমটি করায় সুযোগ থাকেনা, সরাসরি না যেতে পারলে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট সিডি-ভিসিডির মাধ্যমে কখনো মনিটরে কখনো টিভির পর্দায় দেখান। যেমন হার্ভাড ইউনিভার্সিটির ছবি ওয়েবসাইটে দেখিয়েই স্বপ্ন দেখতে বলেন, এটি পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। তুমি বড় হয়ে এখানে পড়বে।

মাঝে মাঝে বিভিন্ন ডকুমেন্টারী দেখান। বিখ্যাত ব্যক্তি, কোনো দেশ-সমাজ-সংস্কৃতির ব্যাপারে ধারণা দেন। জিসান আনন্দ পায়, অনেক কিছুই শেখে তাই বাবা তার দারুণ প্রিয়। আর যোবায়ের চৌধুরীও তার সন্তানের মনকে বুঝেন, তার সৃজনশীলতা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে অনেক ব্যবস্থাই করেন। তবে উত্তম বিকল্পটি তিনি দেন। যেমন-ধরুণ ছেলে বলল বাবা গান শুনব, নাটক দেখব। বাবা বলেন না- না দেখতে পারবে না বরং তিনি কোন্ গানটি শুনলে, কোন্ নাটকটি দেখলে ছেলের জ্ঞান বাড়বে, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে, উদ্ভাবনী ও বিশ্লেষণী শক্তি বাড়বে এরকম গান, নাটক খুঁজে, সংগ্রহ করে আনেন। এখানেই যোবায়ের চৌধুরীর স্বতন্ত্রতা।

জিসানের উত্তম বন্ধু তার বাবা। জিসানের কোন হতাশা, অভিমান নেই। তার স্বপ্ন-ইচ্ছা পূরণ হচ্ছে, সে আনন্দে বেড়ে উঠছে আবার সমবয়সীদের তুলনায় অনেক ব্যাপারেই সে বেশি জ্ঞান রাখে, এগিয়ে থাকে। ভেতর ও বাইরকে গভীরভাবে দেখার জন্য যে মনের চোখ, অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োজন সেটি দিন দিন বাড়ছে। জিসান তাই শুধু চোখ দিয়ে দেখে, কান দিয়ে শুনে, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিয়েই কোনোকিছু অনুভব করে না, মগজ দিয়ে চিন্তা করে, হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতি দিয়ে অনুভব করে-ঠিক যেমনটি চান যোবায়ের চৌধুরী। জিসানের স্বপ্ন সে অনেক বড় হবে, দুঃখী মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হবে।

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ [email protected]

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।