ব্রেকিং নিউজ :
November 23, 2015

বিপিএল’এ হৃত্বিকের প্রশ্ন; দর্শকের নীরবতা ও সচেতন মহলের করণীয়

shishu-3

মো: রিয়াজুল হোসেন ভূঁইয়া

সৃজনশীলতা প্রকাশে চলচ্চিত্র হচ্ছে সবচেয়ে বড় শিল্প মাধ্যম। শিল্প মাধ্যমের এই শাখায় সৃষ্টিশীল পরিচালকরা তাদের কল্পনা প্রসূত বা সত্য কাহিনীকে অভিনয়শিল্পীর অভিনয় নৈপুণ্যের মাধ্যমে সেলুলয়েডের পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন। যেকোনো শিল্প মাধ্যমের মত চলচ্চিত্রেও ঝুঁকি নিয়ে অর্থ লগ্নি করতে হয়। পৃথিবীর চলচ্চিত্র ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই অনেক খ্যাতনামা পরিচালক তাঁর সিনেমা নির্মাণের খরচ জোগাতে গিয়ে নি:স্ব হয়েছেন। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে চলচ্চিত্র ইতিহাসে। অনেক পরিচালক তাঁর শেষ সম্বল বিক্রি করে সিনেমা নির্মাণ করে চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন, পাশাপাশি লগ্নিকৃত অর্থকে শুধু দ্বিগুনই নয়; কয়েকগুন বাড়িয়েছেন। তাই অনেক চলচ্চিত্র বিশ্লেষকের মতে, চলচ্চিত্র শুধু একটি শিল্পই নয়; দিন শেষে এটি ব্যবসাও বটে। কারণ সৃষ্টিশীল এই শিল্পে অর্থ লগ্নি করতে হয় লাভ লোকসানের আশংকা থেকেই।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাস অনেক পুরনো এবং এর ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধশালী। এই দেশের মাটিতে জন্ম নিয়েছে জহির রায়হান, আলমগীর কবির ও তারেক মাসুদের মত বিখ্যাত পরিচালক। জীবন থেকে নেওয়া, সূর্য কন্যা, সীমানা পেরিয়ে, মাটির ময়না’র মত চলচ্চিত্র শুধু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেনি, বিশ্ব চলচ্চিত্রকে জানান দিয়েছে এই দেশের পরিচালকের মুন্সিয়ানার কথা। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে পারেনি জহির রায়হান ও আলমগীর কবিরের পরবর্তী প্রজন্ম।

চলচ্চিত্রে পরিচালককে তার সৃষ্টিশীলতার দিকে নজর দিতে হয়, প্রযোজকদের দৃষ্টি দিতে হয় লগ্নিকৃত অর্থের উপর। তাহলেই সৃষ্টিশীল শিল্প ও বাণিজ্যের সমন্বয়ে চলচ্চিত্র এগিয়ে যাবে তাঁর কাঙ্খিত লক্ষ্যে। কিন্তু ৯০এর দশকের পর বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে অভিশপ্ত হিংস্র শকুন উড়ে বেড়ায়। যার ধারালো নখের আঘাতে জর্জরিত হয় বাংলা চলচ্চিত্র। তখনকার সময়ে এক শ্রেণীর প্রযোজক ও তথাকথিত পরিচালক মিলে তৈরি করে অশ্লীল সিনেমা। কুরুচিপূর্ণ মন-মানসিকতার পরিচালকের জন্য ওই সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী ডানায় ভর করে অশ্লীলতা নামক বিষাক্ত নীল অভিশাপ। তবে এই বিষে নীল হয়ে মৃত্যুবরণ করেনি বাংলা চলচ্চিত্র। বরং বাংলা চলচ্চিত্র মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে স্ব-গৌরভে।

528_1423403412_1280x720

ভঙ্গুর এই চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে বর্তমানে রাত দিন এক করে কাজ করছে এক ঝাঁক তরুণ নির্মাতা। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের বাজারকে গ্রাস করে নিতে চায় প্রতিবেশি দেশ ভারত। দেশের সিনেমা হলগুলোকে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য একের পর এক অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি। চলতি বছরে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় শিল্পী ও পরিচালকরা শরীরে সাদা কাফনের কাপড় পরে বাংলাদেশের হলে হিন্দি সিনেমা মুক্তির বিরোধিতায় মিছিল করে ঢাকার রাজপথে। হিন্দি সিনেমাকে দেশের হলগুলোতে উন্মুক্ত করার অনুরোধ নিয়ে কিছুদিন আগে বাংলাদেশে আসেন বলিউড পরিচালক ও প্রযোজক রমেশ সিপ্পি এবং মুকেশ ভাট। এক বুক হতাশা নিয়ে তারা ফিরে গেলেও এ দেশে তাদের নিয়োগকৃত লবিস্টরা এই বিষয়টি নিয়মিতই দেখভাল করছে।

তাছাড়া যৌথ প্রযোজনার নামে ভারত (টালিগঞ্জ) নিয়মিতই নির্মাণ করছেন যৌথ প্রতারণার চলচ্চিত্র। যৌথ প্রযোজনার সিনেমায় দুই দেশের সমসংখ্যক অভিনয়শিল্পী আলোচনা সাপেক্ষে অভিনয় করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ যৌথ প্রযোজনার সিনেমায় বাংলাদেশি অভিনয় শিল্পীর তুলনায় ভারতীয় শিল্পী বেশি অভিনয় করেছেন। সাম্প্রতিক বাংলাদেশি অভিনয়শিল্পী বিদ্যা সিনহা মীম ও কলকাতার অভিনেতা সোহম অভিনীত ‘ব্ল্যাক’ সিনেমাটি যৌথ প্রযোজনার যথাযথ নিয়মে নির্মাণ হয়েছে কিনা সে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে যদি প্রমাণিত হয় যৌথ প্রযোজনার যথাযথ নিয়ম না মেনে সিনেমাটি নির্মাণ করা হয়েছে, তাহলে বাংলাদেশের হলে মুক্তি পাবে না এই সিনেমা।

 V0vKL6Zচলতি মাসের ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বিপিএলের( বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ) তৃতীয় আসরের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মমতাজ, এলআরবি, চিরকুট ব্যান্ডের পাশাপাশি আমন্ত্রন জানানো হয় ভারতীয় গায়ক কেকে; বলিউডের মেগা স্টার জ্যাকুলিন ও হৃত্বিককে। দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় যে, উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানের আলোর ঝলকানি বাড়াতে হৃত্বিক মঞ্চে উঠবেন সবার শেষে এবং তিনি ৩০ মিনিট পারফর্ম করবেন। কিন্তু মঞ্চে হৃত্বিক পারফর্ম করেন ৫ মিনিটের কম সময়।  ভারত থেকে উড়িয়ে আনা এই বলিউড স্টারকে উপস্থাপিকা বাংলাদেশের ক্রিকেটের টাইগারদের নিয়ে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করেন। উপস্থাপিকার এই অনুরোধকে উপেক্ষা করে তিনি দর্শকের কাছে প্রশ্ন রাখেন- কেন বাংলাদেশের সিনেমা হলে হিন্দি সিনেমা মুক্তি পায় না? তবে হৃত্বিকে কেউ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেননি কেন ভারতে বাংলাদেশি চ্যানেল সম্প্রচার হয় না, কেন যৌথ প্রযোজনার নামে প্রতারণা করা হচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সঙ্গে, কেন আমাদের সিনেমার ভবিষ্যত নিয়ে ভারতের এতো মাথা ব্যাথা? হৃত্বিক হয়তো চেয়েছেন বাংলাদেশে থাকা তাঁর ভক্তদের মধ্যে হিন্দি সিনেমা নিয়ে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দেখতে। কিন্তু হৃত্বিক যেমন তার দেশ ও দেশীয় সিনেমাকে ভালবাসেন ঠিক তেমনি এদেশের  জনগণ ভালবাসেন তাদের দেশ ও নিজস্ব সংস্কৃতির উৎস বাংলা সিনেমাকে। তাইতো হৃত্বিকের ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের সঙ্গে একমত হননি স্টেডিয়ামের গ্যালারী বসে থাকা সচেতন দর্শকরা। হৃত্বিকরা সবসময়ই চাইবেন যেকোনো ভাবেই তাদের সিনেমার বাণিজ্যিকরণের বীজ বাংলাদেশে রোপন করতে।

ভারতের মুম্বাইয়ের সিনেমা পাঞ্জাব রাজ্যের হলে মুক্তি দিতে হলে দ্বিগুন কর দিতে হয় যাতে পাঞ্জাব রাজ্যের নিজস্ব সিনেমা অর্থনৈতিক ভাবে ভেঙ্গে না পড়ে। কিন্তু সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতের সিনেমা বাংলাদেশে হলে চলবে ঠিকই কিন্তু কোনভাবেই দ্বিগুন কর দিতে রাজী নয় ভারত সরকার। ভারত সরকার চাচ্ছে যেভাবেই হোক বাংলাদেশের সিনেমার বাজার দখল করতে। ভারতের এই ফাঁদে পা দিলে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আবারো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে।

আমাদের চলচ্চিত্রকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের কালো থাবা থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কখনোই এদেশের সিনেমাকে আবার তাঁর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যাবে না। চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত ফিরিয়ে না আনলে নাচ ও গানের ছলে হৃত্বিকরা আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের বাজার দখল করতে চাইবেই। সুতরাং এখন সময় এসেছে দেশীয় চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবনার ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার।

বাংলাদেশ২৪অনলাইন/আরআই/এমএম/এআর/এসএ/টিএম

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ [email protected]

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।