ব্রেকিং নিউজ :
March 22, 2016

ইতিহাসের মেধাবী ছাত্রী সোহাগী, ইতিহাসের পাতায় মিলিয়ে যাবে

18858

‘মা টেইলারের কাছ থেকে আমার নতুন জামাটা আজ নিয়ে আইসো, আমি কাল নতুন জামা পরে কলেজ যাবো’। টিউশনিতে যাওয়ার আগে মা’কে এই কথাগুলো বলে গিয়েছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সেই পরিচিত ক্যাম্পাসে আর ফিরে যাওয়া হলো না নাট্যকর্মী ও মেধাবী ছাত্রী সোহাগীর। নরপিশাচের হিংস্র থাবায় ক্ষত-বিক্ষত সোহাগীকে ফিরে আসতে হয়েছে লাশ হয়ে। যেদিন নতুন জামা পড়ে কলেজে যাওয়ার কথা, সেদিনই তাঁকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিতে হয়েছে কাফনের সাদা কাপড় পড়ে। সন্তানহারা মায়ের এই ব্যাথা কী মুছে দিতে পারবে আমাদের সমাজ কিংবা রাষ্ট্র?

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন ময়নামতি সেনানিবাস এলাকায় অলিপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। পরিবার আর্থিক ভাবে তেমন সচ্ছল ছিলো না, তাই সে নিজেই টিউশনি করে খরচ যোগাতো নিজের পড়াশোনার। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে সোহাগী হাত পাততে রাজি ছিল না সমাজের কারো কাছে। তবে সেই সমাজ, সেই সরকার, সেই রাষ্ট্র কী নিশ্চিত করতে পেরেছে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন বের হওয়া হাজারো সোহাগীর নিরাপত্তা দিতে?

গত ২০ মার্চ, রবিবার সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনিতে গিয়েছিল সোহাগী। পড়ানো শেষে সন্ধ্যা সাতটা’য় মায়ের কোলে ফিরে আসতে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় জীবন যুদ্ধে হার না মানা অদম্য সাহসী মেয়ে সোহাগী। কিন্তু দেশের সবচেয়ে নিরাপদ মনে করা হয় যে ক্যান্টনমেন্ট এলাকাকে, সেই ক্যান্টনমেন্টেই কিনা পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় তাঁকে। হয়তো পরিবেশ নিরাপদ মনে করেই সেখানে রাতের আঁধারেও পা ফেলতে দ্বিধা করেনি মেয়েটি। কিন্তু আমরা কি দিতে পেরেছি সোহাগীকে সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা? কিছুইতো চায়নি সোহাগী আমাদের এই স্বার্থপর সমাজের কাছে। শুধু সামান্য একটু নিরাপত্তা- ‘পুরুষ শাসিত এই সমাজ ব্যবস্থায় আমরা তাতেও ব্যর্থ হলাম’। এই লজ্জা সাত জনমেও ঘোচাবার নয়। এই পাপ শত জনমেও মোছার নয়। আমাদের বোন, বান্ধবী কিংবা সহকর্মীকে এই প্রশ্নের কী কোন উত্তর দিতে পারবো আমরা?

প্রতিদিন কাজের উদ্দেশ্য রাস্তায় নামতে হয় আমাদের সবাইকে। চিন্তা একটাই –সুস্থ অবস্থায় আবার শান্তির নীড়ে ফিরে আসা। রাস্তায় বিপদ আসতে পারে। লাশ হয়ে ফিরতে হতে পারে আমাদেরও। কিন্তু সোহাগীর মৃত্যু কোন দুর্ঘটনা নয়। প্রাণচঞ্চল সংস্কৃতিমনা  সোহাগীর জীবন প্রদীপ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত নির্মমভাবে। সন্তানের চিন্তায় দিশেহারা বাবা মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে দেখে তার মেয়ের মাথার চুল পড়ে আছে ঝোপঝাড়ের উপর, তার একটু সামনেই পড়ে আছে জুতা, তার একটু দূরে মোবাইলটা, আর একটু দূরে তনুর নিথর দেহ। শোকার্ত বাবার ‘মা, মা, মা, মা আমার’ আর্তচিৎকারে তখন ভারী হয়ে উঠেছিল ক্যান্টনমেন্টের আকাশ-বাতাস।

সোহাগী আজ আমাদের সবার থেকে অনেক উর্দ্ধে চলে গেছে। সে চলে গেছে এই নষ্ট সমাজ থেকে। আমাদের পাপাচার ও পাশবিকতা তাঁকে এখন আর স্পর্শ করবে না। কোন ভ্রষ্ট নেতার মিথ্যা আশ্বাসে সে এখন আর আশ্বস্ত হওয়ার নয়। তাঁর এখন নিরাপত্তার বালাই নেই। এই নষ্ট-অন্ধ সমাজ ব্যবস্থায় সোহাগী মরে গিয়ে বরঞ্চ বেঁচে গেছে। বেঁচে থাকলে আমাদের সবার মতো তাকেও হয়তো গলে-পচে মরতে হতো। আমাদেরও বেঁচে থাকার মানে নেই। বেঁচে থেকে সোহাগীর মতো আরও অনেকের নির্মম চলে যাওয়া দেখার চেয়ে আমাদের মরে যাওয়াটাই সার্থক। বিচারহীন এই সমাজ ব্যবস্থায় বিচার চাওয়াও এখন পাগলের প্রলাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো আর কয়েক’টা দিন- সোহাগীর কথা ভুলে আমরা লেজ গুঁটিয়ে চলে যাবো অন্ধ প্রকোষ্ঠে। ইতিহাসের মেধাবী ছাত্রী সোহাগী, ইতিহাসের পাতায় মিলিয়ে যাবে। শত হলেও আমরা ভুলে যাওয়া জাতি মাত্র।

তবে সোহাগী বেঁচে থাকবে! পরিবার-বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষী মহলে সে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

মোহাম্মাদ মামুনুর রহমান

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ [email protected]

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।