ব্রেকিং নিউজ :
April 22, 2016

ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা চুরি, হুমকির মুখে ব্যাংকিং খাত

555গত সাত বছরে ছয়টি বড় ধরনের কেলেংকারীতে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। নিকট অতীতে পুঁজিবাজার, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে রিজার্ভ চুরির ঘটনা। এসব আর্থিক কেলেংকারীতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ। অথচ এসব কেলেঙ্কারির একটিরও বিচার হয়নি। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এ দাবি করেন ফিনএক্সেল-এর চেয়ারম্যান ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ।

সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন,বেশ কয়েক বছর থেকেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নানা অনিয়ম দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে চলেছে যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অন্যতম বাধা। এ নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে আস্থাহীনতা ও উৎকণ্ঠা। ভবিষ্যতে এ সকল ঘটনা উত্তরণে এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এ খাতের বিদ্যমান সমস্যা গুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। গত ৭ বছরে দেশে ঘটে যাওয়া আর্থিক কেলেঙ্কারির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ডলার চুরি অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে হাতিয়ে নেয়া, সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপের ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট, ৫টি ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ১ হাজার এক শ ’কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া, পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং ডেসটিনি গ্রুপের চার হাজার ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ। ৭ বছরের আগের সময়ে ব্যাংকিং খাতে আরো ৩টি বড় দুর্নীতি হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের উদ্যাক্তাদের ৫৯৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী এম নুরুন্নবীর ৬৯৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী ওমপ্রকাশ আগরওয়ালের ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ। ব্যাংকিং খাতের আরো কিছু অনিয়ম-দুর্নীতি হলো-ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ বিতরণে অনিয়ম, ১২টি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পাচার, রূপালী ব্যাংক থেকে ৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় হাজার কোটি টাকা লোপাট, বিভিন্নস্থানে ব্যাংক ডাকাতি, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি ও এটিএম বুথ জালিয়াতি। একইসাথে সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, সোনালী ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, সিএসআর খাতে আর্থিক জালিয়াতি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাস, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের অর্থ গচ্ছিত রাখার হার বৃদ্ধি, অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন, ও পরিচালক নিয়োগ, আইটি নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতা।

প্রতিবেদনে বখতিয়ার আহমেদ ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান ১১টি সমস্যা তুলে ধরেন। সমস্যাগুলো হলোঃ ১. বিনিয়োগ না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত পড়ে থাকা; ২.ব্যাংকগুলো যে ঋণ দিচ্ছে তা আদায় করতে না পারা, কিংবা কাকে ঋণ দেয়া হবে তা নিয়ে সঙ্কট তৈরি হওয়া; ৩. ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম ও জালিয়াতি; ৪. ব্যাংকগুলোর কেবল লাভের পেছনে ছোটা; ৫. বিপুল অঙ্কের খেলাপি ও মন্দ ঋণ, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে; ৬. ব্যাংকগুলোর আইটি সিস্টেম সুরতি না থাকা; ৭. মূলধন ঘাটতি, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে; ৮. আমানত সংগ্রহে অসম প্রতিযোগিতা; ৯. ব্যবস্থাপনার সঙ্কট, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে; ১০. সরকারি-বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের অযাচিত হস্তপে; এবং ১১. বাংলাদেশ ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সিবিএ নেতাদের দৌরাত্ম্য। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করে এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে ১৭টি করণীয় তুলে ধরেন তিনি। এগুলো হলোঃ ১. ব্যাংকিং কমিশন গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া; ২. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা; ৩. বেসরকারি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা; ৪. ব্যাংকিং খাতের জালিয়াতি বন্ধ করা; ৫. আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য অভ্যন্তরীণ অডিট করা; ৬. পরিচালক নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন; ৭. ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা; ৮. অতীতের বিভিন্ন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়ন করা; ৯. ট্রেড ইউনিয়নের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা ১০. সৎ-নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা; ১১. খেলাপি ঋণ রোধে ট্রাইব্যুনাল গঠন; ১২. যথাযথ প্রক্রিয়ায় ঋণ অনুমোদন করা; ১৩. আর্থিক বিধিবিধানগুলো অনুসরণ করা; ১৪. মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিরাপদ করা; ১৫. টাকা পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; ১৬. ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে মতবিনিময় করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং ১৭. সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধে অপরাধীদের অতি দ্রুত দৃশ্যমান বিচারের প্রয়োজন। এবং সে বিচার হতে হবে দৃষ্টান্তমূলক। আমাদের মনে রাখতে হবে যদি আর্থিক খাত ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে উৎপাদন পদ্ধতি কোনো কাজে আসবে না। আর এই আর্থিক খাত ঠিক না থাকলে দেশের উন্নয়নের বাধা সৃষ্টি হবে। দেশের রাজনীতি যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা মূলক না হয় তাহলে দেশের ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আর এই খাতে যদি রাজনৈতিক প্রভাব চলে আসে তাহলে দেশ অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।’ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাপক সংস্কার দরকার। এর ব্যবস্থাপনা অদক্ষ। সুশাসনের অভাব রয়েছে ব্যাংকিং খাতে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকে এটি ব্যাপক। ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় এতো বেশি বেড়ে যাচ্ছে যে পুরো খাত ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। বিদেশী ব্যাংক একশ টাকা আয় করতে ৫০ টাকা ব্যয় করে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংক ব্যয় করে ৮৬ টাকা।’

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের আর্থিক খাতে বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে; এ অবস্থা চলতে থাকলে রিজার্ভের টাকা চুরি, বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক ও পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।’ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অযাচিত সব দুর্ঘটনা ঘটছে মন্তব্য করে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি, অন্যান্য দেশেও এ রকম ঘটেছে বলে আমার অন্তত জনা নেই। আর্থিক খাতের দুর্নীতি রোধে যাদের দায়িত্ব রয়েছে তাদের অনেকেই দুর্নীতির সাথে জড়িত। ’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতে নয় সব খাতেই বিচারহীনতা বিরাজ করছে। অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি চলছে। তবে আশার কথা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে তারা যথাসময়ে তাদের প্রতিবেদন পেশ করেছে। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই ছিনতাই হচ্ছে, কিন্তু গ্রাহককে ব্যাংক কোনো নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এমনকি শোনা যায় ব্যাংক থেকেই নাকি জানিয়ে দেয়া হয় কে কত টাকা নিয়ে বের হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ নিরাপত্তায় ভারতীয় কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়ায় সমালোচনা করেন।’

অর্থনীতিবিদ ড. সাজ্জাদ জহির বলেন, ‘অর্থ খাতের যে পরিবর্তনগুলো বিশ্বব্যাপী ঘটছে তার সাথে সঙ্গতি রেখে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। আমাদের সেই দ জনবল নেই যারা প্রযুক্তির ওপর প্রভাব রাখে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন তা করা হচ্ছে না । ’

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ব্যাংকিং খাতে চরম দুরবস্থা চলছে। এ খাতের সমস্যাগুলো সম্পর্কে সবাই অবহিত, কিন্তু কেউ সমাধান করছে না। দলীয়করণ ও রাজনীতি ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, একাউন্ট না থাকার পরও ঋণ দিতে ওপর মহল থেকে ফোন দেয়ার ঘটনা ঘটছে। এভাবে কোনো আর্থিত খাত চলতে পারে না। অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্ব ও নজরদারি আছে কি না সে বিষয় নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রমুখ।

বাংলাদেশ২৪অনলাইন/এসএম

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ [email protected]

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।