ব্রেকিং নিউজ :
August 14, 2016

ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাক্ষর

 ইতিহাসের সেই বিভীষিকাময় শোকাবহ ১৫ আগস্ট আজ। ১৯৭৫ সালে বাঙালির ইতিহাসে কালিমালিপ্ত এই রক্তঝরা দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কয়েকজন চক্রান্তকারী সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন। ইতিহাসের নৃশংসতম ও গভীর মর্মস্পর্শী সেই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হলেও তাঁর আদর্শ বেঁচে আছে এবং থাকবে। প্রতিবছর এই দিনে জাতির পিতাকে হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করে দেশবাসী।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাক্ষর। প্রতিটি বাঙ্গালীর কাছে তিনি ভালোলাগা এক মমতার বন্ধন। বেঁচে থাকার জন্য বাতাস,পানি এবং খাদ্য যেমন অপরিহার্য, তেমনি জাতি হিসেবেও আমাদের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান এবং তা যেকোন বিচারেই। বঙ্গবন্ধু আমাদের আত্মপ্রতিরোধ শক্তি। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ,বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুজিব এক ও অবিভাজ্য। এর চেয়ে সত্য আর কিছু হয় না। বঙ্গবন্ধু সর্বতোভাবে সংস্কারমুক্ত উদার মানবতাবাদী ও ধর্মবোধে কল্যাণকামী । বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুই; তার সঙ্গে কারোরই তুলনা চলে না। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বঙ্গবন্ধু স্রষ্টার এক মহান দান। বাংলাদেশ, বাঙ্গালী জাতি ও বঙ্গবন্ধু এই তিনটি নামই প্রায় সমার্থক। কারণ আবহমান বাংলাদেশ যেমন বাস্তব সত্য, আবহমান বাঙ্গালী জাতিও তেমনই সত্য। আর এই আবহমান বাংলা বাঙ্গালীর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবও একটি বাস্তব সত্য। অসাধারণ চেতনায়,অপরিমেয় ভালোবাসায়, হৃদয়ের ভক্তিতে, অন্তরের শ্রদ্ধায়,সঠিক সুন্দর পবিত্র এক বাস্তবতায়, অসংখ্য প্রানের স্পন্দন ও আন্তরিকতায়, স্বপ্ন ও বিশ্বাসের গভীরতায়, উত্তম প্রেমের মিলন মোহনায় অসাধারণ হয়ে ওঠা এক মহাব্যক্তিত্ব হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তা‍ঁর জীবন এক বিশাল ও বিস্তৃত ব্যাপার। আধুনিক ইতিহাসে ব্যক্তিনায়কের ভূমিকায় বঙ্গবন্ধু এক অনন্য চরিত্র। তারই নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, পেয়েছি লাল সূর্য খচিত সমুন্নত জাতীয় পতাকা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী । বাংলাদেশ নামে এই মানচিত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা,স্বপ্নের রূপকার। এই একটি সাফল্যই তো যথেষ্ট বঙ্গবন্ধুর অমরত্বের জন্য। তিনি কেবল জাতির জনক ছিলেন না, এই রাষ্ট্র বির্নিমানে ধাপে ধাপে রয়েছে তার বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা এবং মেধা। তাই বাংলাদেশের আরেক নাম শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোলাপগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহন করেন। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুনের তিনি তৃতীয় সন্তান। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জনাব তোফায়েল আহমেদ বলেন, মুজিব নাম সংগ্রামের প্রতীক,মুজিব একটি বিদ্রোহ ও বিপ্লবের নাম। মুজিব একটি আন্দোলনের নাম। জীবন জাগার ও জীবনের জয়গান মুজিব। স্বাধীনতার নাম মুজিব। মুজিবের স্মৃতিসৌধের নাম বাংলাদেশ যার চূড়াঁ বাংলার আকাশ। মুজিব জীবনের ক্যানভাস। বঙ্গবন্ধু ভালোবাসার চিরসবুজ ও সতেজ উদ্যান। যেখানে ভালোবাসার কোনো শেষ নেই। বঙ্গবন্ধুর হৃদয় ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসায় ভরপুর। তিনি ছিলেন ভাবাবেগের বেগবান সোনার অগ্নিশিখা। মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার পরও তার ওষ্ঠে যে মৃদু হাসির রেখা দেখা গেছে এমন দেশপ্রেম এ জাতি ভূলবে কেমন করে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আত্মত্যাগের মহিমাকে উজ্জল করে দেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে তিনি নিবেদিত হয়েছেন। যা ইতিহাসের বিরল দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধুকে মন উজার করে ভালবাসা যেত। তার শারীরিক বলিষ্ঠতা, আচরণগত সৌন্দর্য, মানসিক পূর্ণতা, প্রশংসনীয় চরিত্র, চমৎকার ব্যক্তিত্ব, পরিশীলিত অভ্যাস ও কর্মতৎপরতা দেখেই আবাল বৃদ্ধা বণিতা তাকে ভালোবাসত। আয়না আলোতে উন্মুক্ত করলে তা থেকে উজ্জল আভা প্রতিফলিত হয়। ভালোবাসা এ উজ্জল আভা। যা জীবনকে আলোকিত করে। বঙ্গবন্ধুর মনে ঐ আলোর ধারণ ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। বঙ্গবন্ধুর মাঝে সাহসের সাথে শক্তির সমন্বয় ঘটেছিল। বীরত্ব ও পৌরুষব্যঞ্জক দৃঢ়তা জীবনে একান্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অসাধারণ কৃতিত্ব লাভ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু এদেশের সৌন্দর্যের কেন্দ্রভূমি। অন্যান্য সাধারণ যার অস্তিত্ব। তিনি ছিলেন মেহনতি মানুষের প্রশংসার অধিকারী, সকল শোভা এবং দেশের সুখ,শান্তি  সমৃদ্ধির বিস্ময়কর প্রতিনিধি, দেশপ্রেমিক ত্যাগী নেতৃত্বের একটি অনাবিল প্রকাশ। পরিবেশ পরিস্থিতি , পটভূমিকা, প্রাসঙ্গিক লক্ষণসমূহ ও পরিণতি ইত্যাদি বিবেচনায় তিনি ছিলেন অতুলনীয় মেধার অধিকারী। তবে তিনি কখনও নিজের উন্নতির কথা ভাবতেন না, দেশ ও জাতির কল্যাণকে ঘিরেই ছিল তার প্রচেষ্টা। তিনি ছিলেন দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ও উদ্যমী, আলোকিত অন্তরের অধিকারী। তার কথা ও কাজে ছিল পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যতা। এই হিমালয় সম উচ্চতা, এই বঙ্গোপসাগরের বজ্রনিনাদ,  এই মানচিত্র, জাতীয় সংগীত, লাল সবুজের জাতীয় পতাকা, এই সংবিধান; তারই নামে ধন্য, পূণ্য, পরিপূর্ণ। তার কীর্তি, কর্ম, যশ, খ্যাতির গুনকীর্তন অর্চনা দু:সাধ্য। কেননা তিনিই এই বাঙ্গালী জাতিকে জীবন দিয়েছেন,বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছেন এবং সম্মান দিয়েছেন। বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী হয়ে মানবিক মর্যাদায় মহাকালের অমরত্বে তিনিই ইতিহাসে ভাস্বর উজ্জল জ্যোতিষ্ক। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে তার নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসতেন, তার বুকের ভেতর স্পন্দিত হতো মহান এক হৃদয় ষড়যন্ত্র আর কূটকৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছে তার বিশালতা। তবে মৃত বঙ্গবন্ধু দিনকে দিন হয়ে উঠছেন আরও শক্তিশালী। জাতির ইতিহাসে অবিস্মরনীয় আসনেই তাকে অজেয় করে রেখেছে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট সন্ধায় বিবিসি থেকে মন্তব্য করা হয় “বাংলাদেশে যা কিছুই ঘটুক না কেন শেখ মুজিবুর রহমান চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন সেই মানুষটি হিসেবে যিনি না হলে বাংলাদেশের জন্মই হতো না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমনই একজন যাদুকরী নেতা যার মহৎ স্বপ্ন প্রত্যক্ষ করা ও তা ছড়িয়ে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। সারা জীবনব্যাপী স্বদেশভূমির মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত মুজিব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা রুপে জনগনের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হন। সামান্য সাধারণ ঘরে জন্ম , অত্যন্ত কঠিন ও দুর্গম পথ দিয়ে অতিকষ্টে জীবন বিপন্ন করে পদে পদে অগ্রসর  হতে হয়েছে তাকে। বাঙ্গালী জাতির আবহমান কালের আরাধ্য সার্বভৌমত্ব , বাংলার প্রকৃত সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২৬শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে এবং ১৬ই ডিসেম্বর  ১৯৭১ তারিখে উহা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। আর এই সার্বভৌম সম্মান প্রতিষ্ঠার মহানায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলার ইতিহাসের তিনি এমন এক উজ্জল নক্ষত্র যার কোন তুলনা হয়না। তার অবদান এ জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মধ্যে কোন আঞ্চলিক ,ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার প্রশ্রয় ছিলনা। বঙ্গবন্ধু জাতির সকল সদস্যকে সকল জাতীয় কাজ কর্মে সুষম অংশীদারিত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। সামাদ কুদ্দুস ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি লিখেছেন,আর হিংসা নয়। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সন্ত্রাস ও দুনীতির কবর রচনা করে জাতির জনক এর আদর্শে অনুপ্রানিত হোক আমাদের প্রজন্ম। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের প্রয়াস ছিল জাতির একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংজ্ঞা  তৈরি করা। সত্য সুন্দর কল্যানের পূজারী বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন সংকীর্নতার উর্ধ্বে মানুষের মুক্তি। বঙ্গবন্ধুর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ  ছিল মানব প্রেমের শক্তিতে ও সর্বজনীনতায় প্রসারিত। দেশকে এবং দেশের মানুষকে ভালবাসার মাধ্যমেই জীবনের সার্থকতা খুঁজেছেন। তাইতো সেই সময়ে  ওয়াশিংটনের ইভিনিং স্টার(৩০ সেপ্টেম্বও,১৯৭১) বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লিখে, ‘শেখ মুজিবই একমাত্র বাঙ্গালী নেতা, যাকে সমগ্র বাঙ্গালীরা ভালবাসে একমাত্র তিনিই তার নিজস্ব ভাবমূর্তির বলে বাঙ্গালীকে পূর্ণগঠিত করতে পারেন ।’  দি ওয়েস্ট অস্ট্রেলিয়ান সম্পাদকীয়তে (পার্থ,১২জানুয়ারী,১৯৭২) লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর কোন জাতির নেতাকে বস্তুত এমন দুর্গম পথ পেরিয়ে এবং এমনি নাটকীয় ক্ষমতার মঞ্চে আরোহণ করতে হয়নি ।’  মানব হিতৈষনাই বঙ্গবন্ধুর চেতনার মূল প্রেরণা,মৌল শক্তি। সেখান থেকেই উৎসারিত হয়েছে তার মানবপ্রেমের চেতনা। দেশের জন্য দেহের সবটুকু রক্তদানের মহৎ কাজ করার মত মানসিক প্রস্তুতি তার সবসময় ছিল। দেশকে অন্ধের মত ভালোবেসেছেন। বঙ্গবন্ধু উদার মানবতাবাদী ও কল্যাণকামী চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন। তিনি মানবতার জাগরণ চেয়েছেন। মানবতাবাদী চিন্ডায় উদ্বুদ্ধ তিনি মানব আত্মার অবমাননা সহ্য করতে পারেননি। তিনি অনুভব করেন মানব ধর্মকে,মানুষকে,মানবীয় চেতনাকে; তিনি মানব প্রেমের সঙ্গে দেশপ্রেমকে মিশিয়েছেন। তার অন্ডর প্রেরণার উৎস দেশ,দেশের মানুষ। মানুষকে খুঁজতেই তিনি সংগ্রামের সূচনা করেন। ইতিহাসের মহানায়ক , বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন বিশ্বের সকল নিপীড়িত ও বিপ্লবী নেতার জীবন অপেক্ষা অগ্নিঝরা ও করুণ।

বঙ্গবন্ধু যেমন ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক বাঙ্গালী, তেমনি ছিলেন একজন ঈমানদার মুসলমান। তিনি তার সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে ইসলামের প্রচার প্রসারে যে যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল। অথচএক শ্রেনীর তথাকথিত লেবাসধারী মহল  বঙ্গবন্ধুকে ইসলাম বিদ্বেষী বলে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস চালায়। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় এই স্বার্থন্বেষীমহল যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে ইসলাম বিদ্বেষী বলে তার কর্মপরিকল্পনাকে  বাধাগ্রস্ত করার  অপপ্রয়াস চালিয়েছে, আজও তেমনি চিহিৃত মহলটি তার বিরুদ্ধে একই সুরে কুৎসা রটনা অব্যাহত রেখেছে। তাই সকল অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ইসলামের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে। বঙ্গবন্ধু প্রণিত জাতীয়তাবাদের কেন্দ্র ভিত্তি মূল ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ধর্মনিরপেক্ষতার বোধ উৎসাহিত হয়েছে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিকতার প্রতিরোধ থেকে।এই জাতীয়তা দুই অভিজ্ঞতা কেন্দ্র করে নির্মিত। প্রথম অভিজ্ঞতা নির্মিত হয়েছে পাকিস্তানী জাতীয়তা তদন্ত করার মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা নির্মিত হয়েছে পাকিস্তাানী জাতীয়তা প্রতিরোধ ও বিকল্প জাতীয়তা নির্মানের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাকে মতাদর্শ ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে নির্মাণ করেছেন। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নিয়ে এ স্ফুলিংগের মতই বঙ্গবন্ধু আবির্ভাব। বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা স্ফুলিংগে বিস্ফোরিত হয়েছিল। এ চেতনা থেকেই একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে বিস্ফোরনের অগ্নিকণা ছড়িয়ে পড়েছিল টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ড। গোটা দেশের সর্বস্তরের মানুষ তার পরশে আন্দোলিত হয়ে ওঠে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নির্মাতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলতে দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর ভালবাসা, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, লোভ লালসার উর্ধ্বে থেকে শত অত্যাচারের মাঝেও শির উচু রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া,দেশ ও জনগনের স্বার্থে যে কোন ত্যাগের জন্য প্রস্ততু থাকা, জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আপোষহীন থাকা এবং নির্লোভ, সহজ, সাদা-সিধে জীবন যাপন করা ইত্যাদি। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের প্রচন্ড আত্মিক তারনার বিষয়ে বলেন, শুধু বাঙ্গালী হওয়ার জেদ বাংলাদেশের মানুষ যে একটা জাতি এই জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার ঐকান্তিক কামনা, এটাই আমার বিশ্বাস বঙ্গবন্ধুকে আমাদের যুগের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।  বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষের মনে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনা সৃষ্টি করেছেন, সে চেতনাকে উজ্জীবিত করেছেন এবং তার মাধ্যমে সমাজের সকল রের মানুষকে সংগঠিত করেছেন। পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীদের মধ্যে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনাকে দূঢ়মূল করার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তার মাধ্যমে সে চেতনার রাষ্ট্রগত বাস্তব রুপদানের প্রক্রিয়ায়ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। আজও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমাদের সকল বাধাঁ, প্রতিবন্দ্বকতা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে চলতে অনুপ্রেরণা দেয় ।

বঙ্গবন্ধু চেতনার দিগন্তে দেদীপ্যমান এবং প্রগতির সংগ্রামে বলিষ্ঠ ও উজ্জীবন । এদেশের মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফুটানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য । ড.নীলিমা ইব্রাহিম বলেছিলেন,‘ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল বাংলার দু:খী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো । তিনি নিষ্পাপ শিশুর মতো এদেশের মানুষকে ভালোবেসে ছিলেন ।’  বঙ্গবন্ধু ধর্মকে কখনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাননি। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্মের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি অঙ্গীকার ভঙ্গ বা ধোকাবাজীর রাজনীতি করতেন না। জীবনে একাটি বারের জন্য অঙ্গীকার ভঙ্গ করেননি। এ দৃঢ় মানসিকতার জন্য তাকে সারাজীবন জেল জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কোনো বিশেষ সম্প্রদায়, বিশ্বাসের ক্ষুদ্রতা বা সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজের মুক্ত ও উদার ভাবনাকে বন্ধকও দেন নাই। তিনি নির্বিকার দ্বিধাহীন এবং দৃঢ় আত্মপ্রত্যায় নিয়ে কঠিন পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবেলা করেছেন। বাঙ্গালী জাতীয়বাদের নির্মাতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদী কন্ঠস্বর আমাদের তরুণ প্রাণে আজও আলোড়ন তুলে। অকস্মাৎ ধুমকেতুর মত উদিত হয়ে তিনি রুখে দাড়িয়েছিলেন সব অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে। তিনি জানতেন দেশকে মুক্ত করতে হলে সুসংগঠিত শক্তির প্রয়োজন। তিনি তার বক্তৃতার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের অন্তরে বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে দিয়েছেন। তার কথায় বিদ্রোহের অগ্নিশিখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার বক্তৃতা কাজ কর্ম মনের সতেজতা বাড়ায়,হতাশা দুর করে, দু:খ ভুলায় এরকম মহান ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব জাতির জন্য শ্রেষ্ঠ পাওয়া।

বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে ধর্মের নামে ভূলিয়ে দেবার জন্য ষড়যন্ত্র অতীতে চলেছে এখনও চলছেই। বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস চলছে। অথচ তিনি দলীয় নন,জাতীয়; তিনি আর ব্যক্তি নন,ইতিহাসের নায়ক। মহাত্মা গান্ধী জননায়ক ছিলেন, কিন্তুু রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; জওহরলাল নেহেরু যতটা রাষ্ট্র নায়ক ততটা জননন্দিত জননায়ক ছিলেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রভাবের বিস্তার জনগণের হৃদয় থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। তার বঙ্গবন্ধু উপাধী প্রাপ্তি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান এই দুগুণের সাক্ষাত প্রমাণ। আর তার এ অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারনেই তার মৃত্যুতে শোক বিহবল মানুষ হতাশায় বিপর্যস্ত হয়নি বরঞ্চ তারা তা‍ঁর আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছে। বৃদ্ধি করতে হবে বঙ্গবন্ধু চর্চা। জাতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে চর্চাও অর্থই হল আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিকে শক্ত করে তোলা। জেল, জুলুম , নির্যাতন কিছুই বঙ্গবন্ধুকে তার আদর্শ থেকে এক চুল পরিমাণও পেছনে ঠেলতে পারেনি । আজীবন তিনি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম করে গেছেন । ১৯৭১ সালে বাঙ্গালী জাতির মুক্তিযুদ্ধে মরণপণ মানসিকতা যে সামাজিক ধ্যান ধারনার অন্ডসলিলায় অবগাহন করে উঠেছিল। উহার মূলে ছিল  বঙ্গবন্ধু কতৃক চিহিৃত চারটি মূলনীতি। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জীবনের লালিত এবং ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানে সংযোজিত সেই চারটি মূলনীতির অন্যতম একটি হচ্ছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ১৯৭১-এ ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল বাঙ্গালীকে একাকার করে দিয়ে নিশ্চিত জয়ের শক্তি যুগিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান ভেদ-বুদ্ধি নিয়ে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় সেখানে “সবার উপরে মানুষ সত্য” কথাটি চাপা পড়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেই সত্য ও সুন্দরকে রাজনীতিতে তুলে এনেছিলেন। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান নয়, বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী নয়, সব মানুষের কল্যান হয় এমন রাষ্ট্র চেয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যেখানে মানুষে মানুষে প্রেম, বিশ্বাস, একতার শক্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। বঙ্গবন্ধুর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ তাই ছিল মানব প্রেমের শক্তিতে ও সর্বজনীনতায় প্রসারিত। এই খানেই যুগোত্তীর্ন তার রাজনীতি ও বিশ্বজনীন তার নেতৃত্ব।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রোথিত করে একেবারে শেকড় থেকে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করেই এদেশের মানুষ স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য ব্যাপক শক্তি অর্জন করতে থাকে। আমাদের ভাষা, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প জীবনাচার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি এসবের মূল ভিত্তি হলো বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা বাঙ্গালীর বেঁচে থাকার মূল মুক্তির দফা। এ ৬দফা আমাদের জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক চেতনার অধিকারের মূল ভিত্তিকে শক্তি দিয়েছে। জাতীয়তাবাদের চেতনার আলোকে বাঙ্গালী তাদের বেঁচে থাকার দাবী নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠে। ৭০এর নির্বাচনের ফলাফল, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদ ও গনতন্ত্রের উপর ভিত্তি করেই সংগঠিত হয়েছে।  বঙ্গবন্ধুর গতিশীল, সাহসী ও ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে বাঙ্গালী জাতীয়বাদের চেতনায় উজ্জীবিত এভূখন্ডের মানুষগুলো হাজার বছরের পরাধীনতার শৃংখল ছিড়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য। বাঙ্গালী পেয়েছিল তার নিজস্ব রাষ্ট্র ও গর্বিত আত্মপরিচয়। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অন্তর্ভেদী দূরদৃষ্টি,অটল আদর্শ ও সাহসী নেতৃত্বের ফলেই আজ আমরা মুক্ত দেশের গর্বিত নাগরিক। বঙ্গবন্ধুর জীবন আদর্শ দর্শন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত রাজনীতি আমাদের সঞ্জিবনী শক্তি। তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন একটি সন্নিবদ্ধ জাতীয় সত্তা, একটি মানচিত্র, একটি পতাকা ও স্বাধীন-সার্বভৌম একটি ভূখন্ড।

সমৃদ্ধ দেশ, উন্নত জাতি তথা শান্তিময় পৃথিবী গড়ায় বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে সবার  মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। কবি মহাদেব সাহা বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তুলতে হবে।”সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুকে রাখতে হবে সর্বময় দৃশ্যমান এবং প্রাণপণ করে। কেননা দেশের  মাটি মানুষের প্রতি তার অকৃতিম নি:স্বার্থ ভালোবাসা নবীন প্রজন্মকে মুগ্ধ করে,মনে প্রশান্তি আনে। তার জীবন সংগ্রামের সোনালী অধ্যায় মানসিক প্রশান্ডির উৎস। মানুষের প্রতি দরদ, ভালোবাসা আমাদের নতুন গতি দেয়। তাই বঙ্গবন্ধুকে উচ্চকিত করে তুলতে হবে এর কোন বিকল্প নেই। আ আবিস্কারের মধ্য দিয়ে আত্ম জাগরণের যে স্পৃহা বঙ্গবন্ধুকে প্রাণিত করেছে তাহলো সাম্প্রদায়িক বিভেদমুক্ত সম্প্রীতির একটি ভিত্তিমূল। তিনি সম্প্রদায়গত বিভেদ-বিভাজনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তিনি মাথার চূল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত দেশপ্রেমিক ছিলেন। তার মত সাহসী ও দক্ষ নেতা শুধু বাংলার নয় বিশ্ব ইতিহাসে বিরল, অদ্বিতীয়, অপ্রতিদ্বন্ধী। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী, মানুষের কল্যাণে উৎসর্গিত, নি:স্বার্থ প্রাণের মানুষ। তিনি প্রত্যাশা করেছেন সুখী, সমৃদ্ধশীল, সুন্দর বাংলাদেশ।  বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের গর্ব, দশের গর্ব, জাতির অহংকার। কেননা আমাদের অনিশ্চিত পরিবেশকে তিনি দিয়েছেন নিশ্চয়তা, বিশৃংখলায় তিনি আনতে চেয়েছেন শৃংখলা, সমাজের প্রতিস্তরের নিপীড়িত জনগনের তিনি ছিলেন শক্ত হাতিয়ার। বঙ্গবন্ধুই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে উক্ত জাতীয়তাবাদী চেতনার বাস্তব রুপদান করেন তার জীবদ্দশায়, তারই প্রচেষ্টায়। বঙ্গবন্ধুর তিরোধান  তার অস্তিত্বের বিলয় নয়। তার রেখে যাওয়া বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই চিরকাল তার অস্তিত্বের সাড়া পাওয়া যাবে। তার জীবন কর্মের   অতলান্তিক গভীরতা নক্ষত্রচুম্বী মহিমা হয়ে রবে।

বাংলাদেশ২৪অনলাইন/শাওন মুকুল

 

 

 

 

একই রকম সংবাদ

সম্পাদকঃ আলী অাহমদ
যোগাযোগঃ ১৪৮/১, গ্রীণ ওয়ে, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০১৭৯৪৪৪৯৯৯৭-৮
ইমেইলঃ [email protected]

Copyrıght Bangladesh24online @ 2015.               এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ।