প্রশাসনের শীর্ষ পদে বর্তমানে রেকর্ড সংখ্যক কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত হচ্ছেন নিচের কর্মকর্তারা। এর আগে শীর্ষ পদে এত সংখ্যক কর্মকর্তা একসঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে বর্তমানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) রয়েছেন সচিব ও সিনিয়র সচিব। ওএসডি করে রাখায় বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে তাদের। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চরম দলীয়করণ ও নিয়ম-নীতিহীন পদায়ন-পদোন্নতির কারণে প্রশাসনে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতির প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও ওএসডি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কমে যাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর দায়িত্ব গ্রহণ করেন অন্তর্র্বতীকালীন সরকার। এ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী আমলাদের ওএসডি করা হয়, অনেককে পাঠানো হয় বাধ্যতামূলক অবসরে। পাশাপাশি বঞ্চিত আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সচিব, সিনিয়র সচিব ও সমমর্যাদার পদ ৮৪টি। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিবসহ সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ১৭ জন কর্মকর্তা চুক্তিতে রয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসনে মোট ওএসডি আছেন ৫১৬ জন। এর মধ্যে ১২ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব। এছাড়াও দুজন গ্রেড-১ কর্মকর্তা, ৩৩ জন অতিরিক্ত সচিব, ৭৬ জন যুগ্মসচিব, ১৩৬ জন উপসচিব, ১৫৫ জন সিনিয়র সহকারী সচিব, ৯৪ জন সহকারী সচিব এবং আটজন সিনিয়র সহকারী প্রধানকে ওএসডি করা হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক কারণে ১২১ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। বাকি কর্মকর্তারা পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, ছুটি এবং প্রেষণের মতো কারণে ওএসডিতে রয়েছেন। ওএসডি ব্যবস্থায় কোনো কাজ ছাড়াই তাদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগসুবিধা দিতে হচ্ছে সরকারকে।
জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে বিশেষ কাজ সম্পাদনের জন্য চালু করা ওএসডি ব্যবস্থা। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিকভাবে এ ব্যবস্থার ব্যবহারের চরম নজির সৃষ্টি করে। ভিন্নমত কিংবা অন্ধভাবে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশনা মানেননি, তাদের বছরের পর বছর ওএসডি করে রাখা হয়। তাছাড়া আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের শাসনামলে যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা কেউই ওইসব পদে অপরিহার্য নন। মূলত নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চাকরির মেয়াদ শেষে আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের পুরস্কার ছিল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ।
ওদিকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে ওএসডি না করার জন্য সুপারিশ করা হলো। ওএসডি কর্মকর্তাকে কাজ ছাড়াই বেতন-ভাতা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির মাধ্যমে শিক্ষকতা বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাময়িকভাবে পদায়ন করা যেতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, প্রশাসনে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন- মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমুল গনি, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এম এ আকমল হোসেন আজাদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. নেয়ামত উল্লাহ ভূইয়া, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়ের, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী।
এছাড়া ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এ জে এম সালাহউদ্দিন নাগরী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) কাইয়ুম আরা বেগম, বিশ্বব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক শরীফা খান, সচিব মর্যাদায় পর্তুগালে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুল হক চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। এরা সবাই গত বছরের ৫ আগস্টের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন।
বিডি২৪অনলাইন/এন/এমকে